পুলিশকে নজরানা দিয়ে চলে অবাধে পাচার

89

বিধান ঘোষ, হিলি : অন্ধকার ও কুয়াশা ভেদ করে বড়-বড় শিং বেরিয়ে আসছে। লম্বায় এক একটি গোরু প্রায় সাত ফুটের হবে। ধবধবে সাদা। গলার দড়ি ও লেজ ধরে গোরুর সঙ্গেই ছুটে চলেছে ভাড়িরা। কোথায় যাবে? উত্তর এল, লস্করপুর যাব বাবু। দৃশ্যটি হিলির চকগোপাল বিওপি এলাকার। সীমান্ত থেকে গ্রামের দূরত্ব খুব জোর তিন কিলোমিটার হবে। শীতের রাতে গোরুগুলি দেখে অবাক না হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ, এত বড় বড় গোরু এই অঞ্চলে কেন, সারা রাজ্যেই মেলে না। বিশদে জানতে ভাড়িদের সঙ্গে তাই শুরু হল ভাব জমানো। এরপরই শুরু হল আসল গল্প। তারাই জানাল, এই গোরুগুলি অনেক দূর থেকে এসেছে। কত দূর? পঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে বাবু।

কীভাবে পুলিশের নজর এড়িয়ে গোরু নিয়ে হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিলে তোমরা? ভাড়িদের জবাব, অন্য রাজ্যে গোরু কেনা হয়। তারপর লরিতে করে গোরুগুলি সীমান্ত থেকে দূরের হাটে আসে। সেখানে ফের গোরু কেনাবেচা হয়। তারপর পাচার শুরু। কিন্তু কোনও জায়গায় নজরানা না দিয়ে একধাপও এগানো যায় না। সীমান্ত হাট থেকে গোরু কিনে মালিকরা কমিশন এজেন্টদের হাতে দেয়। তারপর গোরুগুলি ম্যাটাডোর, ভুটভুটি করে নিয়ে গিয়ে সীমান্ত থেকে কিছুটা দূরের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে সীমান্ত গ্রামের গোপন ঠিকানা পর্যন্ত গোরু পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব থাকে ভাড়িদের কাঁধে। রাতে সুযোগ বুঝে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশ পাঠানোর কাজ করে চোরপার্টিরা। এজেন্টরা ভাড়িদের নিয়োগ করে ও পারিশ্রমিক দেয়। টাকার বিনিময়ে চোরপার্টিদের ঠিক করেন পাচারচক্রের মাথারা। কোনওমতেই প্রকাশ্যে আসেন না গোরু মালিক অর্থাৎ পাচারের মাথারা।

- Advertisement -

এত গেল গোরুপাচারের কাহিনী। আসা যাক এবার কাফ সিরাপ। হিলির ডুমরনে সীমান্তে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে দুই যুবক। সঙ্গে কাফ সিরাপ। বাইকে নিয়ে কারও জন্য অপেক্ষা করতে চোখে পড়ল। সাহস করে একটু এগিয়ে জিজ্ঞেসা করলাম, এগুলো কোথায় যাবে ভাই? বাইকে পিছনে বসে থাকা যুবক উত্তর দিল, বর্ডার পার হবে। ভাব জমিয়ে যুবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা ক্যারিয়ারের কাজ করেন। বোতল প্রতি মেলে ১০ টাকা। ওই যুবকদের কথায়, উত্তরপ্রদেশ, বিহার সহ অন্য রাজ্য থেকে কাফ সিরাপ মালদায় আসে। সেখান থেকে দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর, বালুরঘাটে নিয়ে আসা হয়। তারপরে হিলি, কুমারগঞ্জ, বালুরঘাট সহ দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন সীমান্তে পৌঁছে যায়। সীমান্তে যেভাবে বিএসএফ রয়েছে সক্রিয়, ভেতরের পুলিশ সেভাবে সক্রিয় হলে পাচারই উঠে যেত।

পুলিশ সক্রিয় নয়! কেন একথা বলছেন? উত্তর এল, পুলিশের নীচুতলার কর্মীরা বিভিন্নরকমভাবে সেলামি নিয়ে থাকেন। নাকা চেকিংয়ের জুলুম চালিয়ে তোলা আদায় করা হয়। আবার থানাগুলিতেও মাসোহারা পৌঁছে দিতে হয়। এভাবেই আড়াল করা হয় পাচার।

এত গেল গোরু ও কাফ সিরাপ পাচারের কথা। ত্রিমোহিনীর শ্রীরামপুর সীমান্তে দাঁড়িয়ে থমকে যেতে হয়। সেখানে আবার গজিয়ে উঠেছে গাঁজার রমরমা কারবার। গাঁজার প্যাকেট নিয়ে ওঁত পেতে রয়েছে ক্যারিয়াররা। বিএসএফ একটু ওদিক হলেই বাঁশের বেড়ার ওপর দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ছুড়ে দেবে গাঁজার প্যাকেট। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কোচবিহার থেকে হিলিতে গাঁজা এসে পৌঁছায়। নাইট বাস ও ট্রেনে করে মহাজনের ঘর থেকে মালিকের ডেরা পর্যন্ত গাঁজা নিয়ে আসা হয়। এক্ষেত্রে ডাক মাস্টারের হাতে প্রতি কেজিতে প্রণামি পৌঁছে দিতে হয়। কখনো কখনো সবজির গাড়িতে করে লুকিয়ে গাঁজা নিয়ে আসা হয়। গাঁজা পাচারের দীর্ঘপথে পুলিশ ধরপাকড় করে না? পাচারকারীদের থেকে অবলীলায় উত্তর এল সব সেটিং থাকে। তবে মাঝেমধ্যে ধরপাকড় হয়। কিন্তু তা নগণ্য।

হিলির জামালপুর, আগ্রা, আপ্তৈর, হাঁড়িপুকুর, বালুরপাড়া, গোঁসাইপুরে কান পাতলেই ইয়াবা ও সাপের বিষ পাচারের কথা শোনা যায়। পাচারকারীরা বলছে, ভিনরাজ্য থেকে মুর্শিদাবাদ ও মালদায় ইয়াবা নিয়ে আসা হয়। তারপর রানারের মাধ্যমে সীমান্তে পৌঁছে যায়। পুলিশের আওতাধীন রুট দিয়ে কীভাবে অনায়াসে সীমান্তে ইয়াবা পৌঁছোচ্ছে? প্রশ্ন শুনেই পাচারকারীদের পালটা প্রশ্ন, পাড়ায় পাড়ায় সিভিক, নাকা চেকিং, কিন্তু কী করে মাল আসছে?

তারপরই অকপট পাচারকারীরা। জানাল, পুলিশকে এড়িয়ে দুই নম্বরি ব্যবসা করা সম্ভব নয়। সব জায়গায় কথা বলে তবেই কাজ হয়। পাচারকারীদের কথায় স্পষ্ট, পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পাচার কোনওমতেই সম্ভব নয়। সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার এলাকা বিএসএফের আওতার মধ্যে পড়ে। বর্তমানে অবশ্য এই পরিধি বাড়ানো হয়েছে। তবে পুলিশের ক্ষেত্রে কিন্তু এই বিধিনিষেধ নেই। সীমান্ত থেকে ভেতরের সম্পূর্ণ অংশই পুলিশের কাজের এক্তিয়ারভুক্ত। সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার রোধের চেষ্টা চালান বিএসএফ জওয়ানরা। কিন্তু ঘরের ভেতরের পাচারের রাশ টানতে কার্যত ব্যর্থ পুলিশ।

বিএসএফের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, শুধু বিএসএফ পাচার বন্ধ করতে পারবে না। সীমান্তে পাচারের সামগ্রী পৌঁছানো রোধ করা গেলে তবেই পাচার বন্ধ করা যাবে। সীমান্তে পাচারের মাল পৌঁছে গেলে, সেগুলি বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে চলে যায়। তবে পাচারের সময় জওয়ানরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রুখে দেন। সামগ্রী বাজেয়াপ্তও করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় দুষ্কৃতীদের। তবে পুলিশকে আরও সক্রিয় হতে হবে।