সেফ হাউসে মজা, বাড়ি ফিরতে অনীহা চার বৃদ্ধার

267

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : লকডাউনে সংসারের আয় কমেছে। বাড়ির অন্য সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পর নিজের ভাগে বলতে গেলে কিছুই থাকছে না। অথচ এখানে পরিস্থিতি অন্য। ভরপেট খাবার তো মিলছেই, সঙ্গে টিভি, তাস, লুডু। তাই ছুটি হয়ে গেলেও ধূপগুড়ি গার্লস কলেজ সেফ হাউস থেকে চার বৃদ্ধা কোনও মতেই বাড়ি ফিরতে চাইছেন না। তাঁদের নিয়ে কী করা যায় তা ভেবে প্রশাসনের কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ। কোভিড পরিস্থিতিতে নার্সিংহোমগুলির দৌরাত্ম্য চালানোর খবরের মাঝে এ যেন এক টাটকা হাওয়াও বটে।

উদ্বেগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য প্রশাসন অবশ্য কিছুটা নিশ্চিতও। ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সুরজিৎ ঘোষ বলছেন, করোনা সংক্রামিতরা যাতে বাড়িতে না থেকে সেফ হাউসে এসে থাকেন সেজন্য সবসময়ই তাঁদের অনুরোধ করা হয়। এবারে এখানে এসে এখান থেকে কেউ যেতে চাইছেন না, এমন অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে একদম অপ্রত্যাশিত। এটা আমাদের হাতে হাত দিয়ে লড়াইয়ের সুফল ভেবেই খুব ভালো লাগছে।

- Advertisement -

২৮ মে ১০০ বেড নিয়ে ধূপগুড়ি গার্লস কলেজে সেফ হাউস চালু হয়। বর্তমানে এখানে ১৫০ জনকে রাখার পরিকাঠামো রয়েছে। জেলায় সংক্রমণ বৃদ্ধি সত্ত্বেও চালুর প্রথম চার-পাঁচদিনে এখানে আবাসিকের সংখ্যা বাড়ছিল না। এর জেরে চিকিৎসক থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা বেশ মনমরাই ছিলেন। পরে অবশ্য আবাসিকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সুস্থ হয়ে অনেকে বাড়িও ফিরে গিয়েছেন। বর্তমানে এখানে ৭৫ জন রয়েছেন। সুস্থ হয়ে যাঁরা বাড়ি ফিরেছেন তাঁদের সূত্রে খবর, এখানকার পরিষেবা নিয়ে কারও কোনও সমস্যা নেই। বরং প্রচুর প্রশংসা রয়েছে। পানীয় জলের জন্য উন্নতমানের ফিল্টার, স্নানের জন্যে গরম জল। হাইস্পিড ইন্টারনেট সহ প্রতিটি ওয়ার্ডেই স্মার্ট টিভি, পছন্দের গান শোনার জন্য ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম। এ ছাড়া আবসিকদের সময় কাটানোর সঙ্গী হিসেবে প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্যারম, লুডু, দাবা, এমনকি তাসের সেটও। শোওয়ার ব্যবস্থা বেশ ভালো। সকাল-বিকেল স্বাস্থ্যসম্মত টিফিন। দুপুর ও রাতে পাতে ঘুরিয়েফিরিয়ে নিরামিষ ও মাছ-মাংস। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা খাবারের মান যাচাই করে তবেই তা এখানে পাঠান। ২৪ ঘণ্টাই আবাসিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিষেবা দিচ্ছেন। পর্যাপ্ত ওষুধ ও অক্সিজেনের ব্যবস্থাও রয়েছে।

আর এটাই স্বাস্থ্য প্রশাসনের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমবার ছুটি হলেও তাঁকে যাতে বাড়ি না ফেরানো হয় সেই দাবিতে এক বৃদ্ধা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে রীতিমতো কান্নাকাটি জুড়ে দেন। কেন এমনটা বলছেন বলে প্রশ্ন করা হলে ওই বৃদ্ধা জানান, কার্যত লকলাউন তাঁর সংসারে টানাটানি বাড়িয়েছে।

বাড়ির বয়স্ক ও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পর নিজের পাতে কোনও খাবার থাকছে না। জীবনে কোনও দিন হোটেলে থাকা হয়নি। কিন্তু সেখানে কেমন পরিষেবা মেলে তার বিস্তর গল্প শুনেছেন। কোনও দিন হাতে টাকা হলে নামী হোটেলে গিয়ে কটা দিন থাকবেন বলে স্বপ্নও দেখেছেন। করোনা সংক্রামিত হওয়ার পর ধূপগুড়ি গালর্স কলেজের সেফ হাউসই তাঁর কাছে সেই স্বপ্নের হোটেল। একই বক্তব্য আরও তিন বৃদ্ধার। তাঁদের কেউই বাড়ি ফিরতে চান না। অথচ মাত্র কদিন আগেই সংক্রামিতদের সেফ হাউস বা কোভিড হাসপাতালে না যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে স্বাস্থ্য আধিকারিকদের মুখে আক্ষেপ শোনা গিয়েছিল। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করায় তাঁদের মুখে আপাতত যুদ্ধজয়ের হাসি।

কী কারণে এই বৃদ্ধাদের এই দাবি? সাইকোলজিস্ট ডাঃ প্রশান্তচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এই অতিমারি ও কার্যত লকডাউন পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনে পড়েছে। পরিবারের রোজগেরে পুরুষ সদস্যের কাজ ও আয় দুই-ই প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়ানোয় সংসারের হাল ধরে থাকা মহিলারা উভয় সংকটে পড়েছেন। একদিকে সন্তান ও পরিজন নিয়ে সংসার চালানোর চাপ, অন্যদিকে হাতে প্রতিনিয়ত কমে আসা রসদ। এই দুয়ের চাপে প্রতিদিনের চেনা সংসারের প্রতি তাঁরা বীতশ্রদ্ধ। সংক্রামিত হয়ে সেফ হাউসে এসে তাঁরা এই ঘেরাটোপ থেকে মুক্তির স্বাদ খুঁজে পাচ্ছেন।