হাঁড়িয়ার আসর বন্ধ করে আদিবাসী গ্রামে ফুরিদা এখন রাজ্জো

তমালিকা দে : প্রায় ২০ বছর আগে তাঁর লড়াই শুরু হয়েছিল। তখন গায়ে মারের দাগগুলো মিলিয়ে যায়নি। মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে বেদম মারত স্বামী। বিয়ের কয়েকদিন পর থেকে সেই মার খাওয়া শুরু। গঙ্গারামপুর চা বাগানে ফুরিদা এক্কার ঘটনা কোনও ব্যতিক্রম ছিল না। চা বাগানের কুলি লাইনের ঘরে ঘরে প্রত্যেক রাতে ঘরের বৌদের ফুঁপিয়ে কান্না আর চিৎকার সবার যেন গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল সেই কুলি মহল্লায়। তাঁর নাম ফুরিদা এক্কা। দাঁতে দাঁত চেপে স্বামীর মার খেতে খেতে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন গ্রাম থেকে হাঁড়িয়ার এই আসর তিনি তুলে দেবেন। ২০ বছর লড়াইয়ে পর তিনি গ্রামকে হাঁড়িয়ার কারবারিদের গ্রাস থেকে ছিনিয়ে এনেছেন। লড়াইটা অবশ্য শুরু হয়েছিল নিজের বাড়ি থেকেই। দিনের পর দিন নিজের স্বামীকে বুঝিয়েছেন এভাবে মদ খেলে সংসার ভেসে যাবে।

বয়স এখন ৬৫। এই বয়সেও রাতবিরেতে কোনও মহিলা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালে তাঁকে ফেরান না ফুরিদা। কয়েক বছর আগেকার কথা। বাগানেরই এক প্রতিবেশী মহিলা এসে তাঁকে জানিয়েছিলেন, স্বামীর অত্যাচারের কথা। শুনেই ফুরিদা সোজা চলে যান সেই বাড়িতে। মহিলার স্বামীকে বোঝান এভাবে চললে তাঁর সংসারটাই ভেসে যাবে। আর এরপরও কথা না শুনলে মানে মারধর বন্ধ না হলে অন্যরকম ব্যবস্থা নেবেন। এরপর আর ওই মহিলার গায়ে হাত তোলেননি তাঁর স্বামী। অনেক সময় হাঁড়িয়া কারবারিদের ঘাঁটিতে একা চলে গিয়েছেন। হুমকি শুনে ফিরে এসেছেন। কিন্তু হার মানেননি। গ্রামে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন অন্য মেযোও। আস্তে আস্তে গ্রামে গড়ে উঠেছে ফুরিদার গুলাব গ্যাং। গ্রামের মেয়েদের কাছে তিনি যেন রাজ্জো। তিনি বুঝিয়েছেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে এই অত্যাচার বন্ধ হবে না। মেয়েদের সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে হার মেনেছে হাঁড়িয়ার কারবারিরা। গ্রামে হাঁড়িয়ার ঠেক বন্ধ হয়েছে।

- Advertisement -

ফুরিদা বলেন, আমি আদিবাসী মেয়ে জীবনে অনেক লড়াই করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু কখনও হেরে যাইনি। আমাদের আদিবাসীদের মধ্যে হাঁড়িয়া তৈরির চল রয়েছে। এই হাঁড়িয়ার জন্য অনেকের সংসার ভেঙে গিয়েছে। গ্রামের মেয়েরা যাতে পরিবারের নির্যাতনের শিকার আর না হয় সেজন্য আমি পুরো গ্রামে এই কারবার বন্ধ করিয়েছি। গ্রামের মহিলারা এখন অনেক শান্তিতে রয়েছেন। পাশাপাশি আমি স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে রয়েছি। সেখানে মহিলাদের স্বনির্ভর করার জন্য মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। গ্রামের প্রচুর মহিলা এই প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বনির্ভর হয়েছেন।

ফাঁসিদেওয়ার বিডিও সঞ্জু গুহ মজুমদার বলেন, এরকম মহিলাকে সত্যিই সাধুবাদ জানানো দরকার। চা বাগানের মানুষের উপার্জন কম। সেই টাকাও অনেকে হাঁড়িয়া আসরে খরচ করে ফেলেন। এই কারবার বন্ধ করা খুবই জরুরি। হেটমুড়ি সিংহীঝোরা গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য লাভলিনা টপ্পো বলেন, ফুলিদা দিদির কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি নিজেও ওঁর সঙ্গে কয়েকবার গিয়েছিলাম। হাঁড়িয়ার কারবারের জন্য অনেক পরিবার নষ্ট হচ্ছিল। উনি পরিবারগুলোকে বাঁচিয়েছেন। আর গ্রামের মেয়েরা বলছে, ফুরিদা দিদি তো এ গ্রামে দেবী দুর্গা। আমরা মেয়েরাও যে অনেককিছু করতে পারি, সেটা তো উনি শিখিয়ে দিলেন।