রাজশ্রী প্রসাদ, পুরাতন মালদা : কোথাও লাক হুইল, কোথাও তিনপাত্তি, কোথাও বা গুটি বোর্ড। আমবাগানের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে প্রায় শখানেক জুয়ার আসর। আর সেই সব আসরে বাজি ধরছেন বাড়ির মহিলা, পুরুষ, শিশু, বুড়ো সকলেই। জুয়ার আসর নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় পুলিশ ও প্রশাসন। বরং পুলিশি নিরাপত্তাতেই চলল জুয়ার মেলা।

পুরাতন মালদার শতাব্দীপ্রাচীন জুয়াড়ির মেলায় এক দিনের জন্য জুয়া খেলাটাই ধর্ম। তবে জুয়া এখানে লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ্য মাত্র। সংসারের মঙ্গল কামনায় মা ষষ্ঠীর পুজো ঘিরেই এই মেলার সূচনা। পুরাতন মালদা পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোকাতিপুর কলোনির আমবাগানে প্রতি বছর এই মেলা বসে। কয়েকশো বছর পুরোনো এই মেলাকে ঘিরে একাধিক লোককথা প্রচলিত। কথিত আছে, মৃত স্বামী লক্ষীন্দরের দেহ কলার ভেলায় ভাসিয়ে সতী বেহুলা পুরাতন মালদার মোকাতিপুর ঘাটে এসে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি দেখেন এক ব্যক্তি জুয়া খেলায় সর্বস্ব খুইয়ে নদীর তীরে বসে কাঁদছেন। বেহুলা তাঁর হাতের সোনার কাঁকন ওই ব্যক্তিকে দান করে আশীর্বাদ করেন। বেহুলার আশীর্বাদে ওই ব্যক্তি পুনরায় জুয়ায় বাজি ধরলে তাঁর হৃত সম্পদ ফিরে পান। তারপর থেকেই বেহুলা নদীর পাড়ে আমবাগানে চালু হয় জুয়াড়ির মেলা।

এই নদীর মেলা নিয়ে আরও একটি কথা প্রচলিত আছে। এখন যেখানে মেলা বসে, সেখানে এক সময় গভীর জঙ্গল ছিল। লুটেরাদের ভয়ে দিনের বেলাতেও সেই জঙ্গলে কেউ প্রবেশ করতেন না। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত মা ষষ্ঠীর মন্দিরে পুজো দিতে যেতেই হয় মহিলাদের। তাই পুজোর সময় পরিবারের পুরুষরা পাহারা দেওয়ার কাজ করতেন। পাহারা দেওয়ার কাজ সহজ করতে নিজেদের মধ্যে তাস খেলতে শুরু করেন তাঁরা। কালের হাত ধরে সেই তাস খেলা থেকেই নাকি জুয়ার মেলার সূচনা। সেই থেকেই ষষ্ঠী পুজোকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসে এই মেলায়। তবে কারণ যাই হোক না কেন, পুরাতন মালদার এই মেলা এখন শুধু জেলা নয়, ভিনজেলার মানুষের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মূলাষষ্ঠীর দিন এই মেলাজুড়ে বসে জুয়ার আসর। বাড়ির বউ, বাচ্চা, বুড়ো সকলেই জুয়ায় বাজি ধরেন।

কুন্তি হালদার নামে এক গৃহবধূ বলেন, প্রতি বছর এই মেলায় আসি। পুজো দেওয়ার পাশাপাশি মেলায় জুয়া খেলাতেও অংশ নিই। এটাই এই মেলার রীতি। মৌসুমি সিন্হা নামে অপর এক গৃহবধূ বলেন, আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে মেলায় আসি। এখনও পর্যন্ত পঞ্চাশ টাকা বাজি ধরে একশো টাকা জিতেছি। আজ সবাই জুয়া খেলে। এতে দোষের কিছু নেই। জুয়া খেলার পাশাপাশি অবশ্য আরও একটি কারণে এই মেলা বিখ্যাত। তা হল লেউড়ি। চিনির রসকে কড়া পাক দিয়ে তারপর তাকে টুকরো লজেন্সের আকারে গড়ে তৈরি হয় এই মিষ্টি। শুধুমাত্র এই মেলায় একদিনের জন্যই এই মিষ্টি পাওযা যায়। এই মিষ্টির কারণেই মেলাকে অনেকে লেউড়ির মেলাও বলেন।

এখানে পুরুষানুক্রমে লেউড়ি বিক্রি করতেন গোবিন্দ দাস। তাঁর নাতি শিবু দাস এখন লেউড়ি বানান। তিনি জানালেন, এই মেলায় যেমন জুয়া খেলতে ভিড় হয়, তেমনই লেউড়ি কেনাটাও একরকম দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা পুরুষানুক্রমে এই ব্যবসা করছি। চম্পা দাস নামে আরেক বিক্রেতা বলেন, লেউড়ি ছাড়া এই মেলা অসম্পূর্ণ। একদিনের এই মেলা কয়েকশো বছরের প্রাচীন। জুয়া খেলার রীতিও চলে আসছে বহুদিন ধরে। তাই এই একদিন বুক ঠুকে জুয়ায় বাজি ধরেন এলাকার মানুষ। জেতাহারার থেকেও মেলার আনন্দটাই প্রধান বলে জানালেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের ঢল নামে মেলায়। দিন শেষ হতেই সাঙ্গ হয় মেলা। তারপর অপেক্ষা আরও একটা বছরের।