সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : ছোটবেলা থেকেই মুখের ও গলার কারসাজিতে কখনও কাক, কখনও কুকুর, কখনও বা ব্যাং-এর ডাকের আওয়াজ করে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী থেকে বন্ধুবান্ধবদের তাক লাগিয়ে দিতেন হরিশ্চন্দ্রপুরের বাসিন্দা গৌতম প্রামাণিক। তিনি হরিশ্চন্দ্রপুরের মানুষের কাছে মিষ্টু নামে পরিচিত। তারপর তার এই দক্ষতার ওপর ভর করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক মঞ্চে খতিয়ে হরবোলা শিল্পী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। যদিও এখনও পর্যন্ত পাননি সরকারি কোনও সম্মান।

ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় পাঠ্যবইয়ে থাকা সত্যজিৎ রায়ের লেখা সুজন হরবোলার গল্প পড়ে হরবোলা হওয়ার শখ মাথায় চাপে। পশু-পাখিদের ডাক রপ্ত করার জন্য স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত ছুটে গিয়েছেন বিভিন্ন পাহাড়-জঙ্গলে। হরিশ্চন্দ্রপুরের তাঁর ছোট্ট বাড়িতে বসে বছর চল্লিশের গৌতমবাবু আক্ষেপের সুরে জানালেন, খুব কম বয়স থেকেই আমি হরবোলা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি। একটা সময় হরিশ্চন্দ্রপুর সহ জেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হরবোলা করে শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছিলাম। তবে হরবোলা করে যা আয় হয় তা দিয়ে আর সংসার চলে না। তাই পেটের তাগিদে এখন আর নিয়মিত হরবোলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারি না। তবে অভ্যাস ছাড়িনি। এখনও সকাল হলেই আমি হরবোলা অভ্যাস করতে শুরু করি। মরচে ধরতে দেইনি আমার অভ্যাসে।

- Advertisement -

কথা বলতে বলতে গৌতমবাবু শোনালেন বদরি, মুনিয়া, টিয়া, চড়ুই পাখির আওয়াজ। শোনালেন বসন্তের কোকিলের আওয়াজ। তিনি আরও জানালেন, একটা সময়ে আমি ভারত সরকারের মিনিস্ট্রি অফ ইয়ুথ অ্যাফেয়ার্স ও কালচারের নেহেরু যুব কেন্দ্রের মালদা জেলা শাখার সঙ্গে অনেক জায়গায় কাজ করেছি। বিভিন্ন ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই হরবোলা শিল্পটাকে তুলে ধরেছিলাম। তখন একটা মাসিক ভাতার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু বহুদিন হল সেই কাজের সঙ্গেও আর যুক্ত নেই। এখন আমি একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করি। সেই সূত্রে হরিশ্চন্দ্রপুর সহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে আমাকে ঘুরতে হয়। কাজের ফাঁকে এই লুপ্তপ্রায় হরবোলা শিল্পকে গ্রামের শিশুদের মাঝে তুলে ধরছি। শিশুরা এতে আনন্দ পাচ্ছে। কেউ শিখতে চাইলে তাকে শিখিয়ে দিই। তবে তার জন্য কোনও পয়সা নিই না।

নেহেরু যুব কেন্দ্র মালদা জেলা শাখার প্রাক্তন কোঅর্ডিনেটর শ্যামল রায় জানালেন, গৌতম প্রামাণিক বহুদিন আমাদের এখানে কাজ করেছেন। তখন তার বয়স খুব কম ছিল। অল্প বয়সে এত নিখুঁতভাবে হরবোলাতে দক্ষ ছিলেন, তাতে আমাদেরই আশ্চর্য লাগত। উনি আমাদের এই কেন্দ্রের অনেক ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হরবোলা নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। হরিশ্চন্দ্রপুরের প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী চন্দ্রনাথ রায় জানান, গৌতম প্রামাণিক অত্যন্ত উঁচুদরের হরবোলা শিল্পী। হরিশ্চন্দ্রপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা এখনও তাঁকে আমন্ত্রণ জানাই। তাঁর হরবোলা শুনে এখনকার প্রজন্মের শিশুরাও অনেক আনন্দ পায়। আমার মনে হয় এই হরবোলা শিল্পীকে সরকার থেকে সম্মান জানানো উচিত। গ্রামে গঞ্জে এরকম অনেক প্রতিভা লুকিয়ে আছে যাঁরা নির্দিষ্ট সাহায্য, পরিকাঠামোর অভাবে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছেন।

হরিশ্চন্দ্রপুরে স্থানীয় কবি দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় জানালেন, হরবোলা লুপ্তপ্রায় শিল্প। বাংলার সংস্কৃতি থেকে হরবোলা নামক শিল্পটি আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। রূপকথার গল্পে আমরা হরবোলার কথা পড়েছি। এখনকার শিশুরা হরবোলা কী জিনিস তা তারা বোঝে না। হরিশ্চন্দ্রপুরের গৌতম প্রামাণিকের চেষ্টায় এখনও হরবোলা শিল্প বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। এভাবেই আস্তে আস্তে বাংলার সমাজ জীবনে এই শিল্প পুনর্জীবন লাভ করবে।

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত গায়ক সৌমিত্র রায় জানালেন, বাংলার প্রাচীন শিল্প হরবোলা। গ্রামবাংলায় এরকম অনেক শিল্পী আছেন যাঁরা এই শিল্পের সঙ্গে আজও জড়িয়ে আছেন। মানুষ নিজের গলা দিয়ে বিভিন্ন রকম পশু-পাখির ডাক বের করে হরেক রকম বোল থেকেই হরবোলা নামটার উৎপত্তি। রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেগুলো হয়, এই সমস্ত শিল্পীদের সে অনুষ্ঠানগুলিতে অল্প সময়ে জন্য হলেও সুযোগ দেওয়া উচিত। তাতে তাঁরাও যেমন উৎসাহিত হবেন, তেমনই বাংলার দর্শকরাও এদের সম্পর্কে জানতে পারবেন।