স্বপ্নের উড়ান, মেয়েদের জন্যে ‘ম্যাজিক’ প্রকল্প নিয়ে এলেন বিডিও

681
ছবি: পঙ্কজ ঘোষ

গৌতম দাস, গাজোল: ‘ম্যাংগো ভ্যালি’ থেকে আগামী দিনে কি ‘সিলিকন ভ্যালি’তে রূপান্তরিত হতে পারে মালদা। স্বপ্ন কিন্তু দেখাতে শুরু করে দিয়েছেন গাজোলের বিডিও নবীনকুমার চন্দ্রা। গুগলের সঙ্গে জুটি বেঁধে গাজোলের এক ঝাঁক মেয়েকে নিয়ে এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার পথে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে গুগলও।

ভারতের মধ্যে প্রথমবার মালদার গাজোলেই এধরনের প্রকল্প রূপায়িত হতে চলেছে। প্রকল্পের নাম ‘ম্যাজিক’ (মালদা গার্লস গো কোডিং)। গুগলের সহযোগিতায় বিভিন্ন কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, হার্ডওয়ার এবং সফটওয়্যারের কাজ শিখছে প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েরা। আর এই কাজের পুরোভাগে রয়েছেন গাজোলের বিডিও নবীনকুমার চন্দ্রা।

- Advertisement -

আরও পড়ুন: রত্নার পাশে দাঁড়ালেন জাতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল

স্বপ্নের উড়ান, মেয়েদের জন্যে ‘ম্যাজিক’ প্রকল্প নিয়ে এলেন বিডিও| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal India
ছবি: পঙ্কজ ঘোষ

তবে এই ঘটনার পেছনে রয়েছে বড় একটি গল্প। তা জানার জন্য আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ২০১৯ সালের ৮ মার্চের দিনে। সেদিন ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিডিওর উদ্যোগে অন্নদাশংকর সদনে বেশকিছু স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে চলছিল আলোচনা সভা। সেই আলোচনা সভায় বিডিও নবীনকুমার চন্দ্রা ছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাদের আগামী দিনের লক্ষ্য কী এবং তারা বড় হয়ে কে কী হতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তরে রানীগঞ্জ কৃষ্ণচন্দ্র হাইস্কুলের এক ছাত্রী রোজিনা খাতুন জানায়, সে বড় হয়ে বিডিও হতে চায়। তার কথা শুনে উৎসাহ প্রকাশ করেন স্বয়ং বিডিও।

সেদিন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সবাইকে চমকে দিয়ে রোজিনাকে নিজের চেম্বারে নিয়ে যান নবীনকুমার চন্দ্রা এবং তাকে বসিয়ে দেন বিডিওর চেয়ারে। দুই ঘণ্টার জন্য বিডিওর দায়িত্ব পালন করে রোজিনা। সেদিনই বিডিও ঘোষণা করেন, মেয়েদের জন্য কিছু একটা করতে চান তিনি। বিশেষ করে মেধা থাকা সত্ত্বেও যে সমস্ত মেয়েরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় তাদের জন্য কিছু একটা করবেন তিনি। জেলাশাসককে জানান তাঁর পরিকল্পনার কথা। তাঁর পরিকল্পনার কথা শুনে উৎসাহ প্রকাশ করেন জেলাশাসক। প্রকল্পটি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। এরপরই জোরকদমে কাজ শুরু করেন নবীনবাবু। প্রথম পর্বে গাজোলের শ্যাম সুখী বালিকা শিক্ষা নিকেতনের ২০ জন ছাত্রীকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর পথচলা।

আরও পড়ুন: বিনা পারিশ্রমিকে মাস্ক তৈরি করছেন রায়গঞ্জের দুই গৃহবধূ

হঠাৎ করে কেন তিনি এধরনের উদ্যোগ নিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে নবীনবাবু জানান, আইএএস হিসেবে মালদা জেলায় কাজে যোগদান করেন তিনি। জেলায় আসার আগে জেলার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করেন এবং পড়াশোনা করেন তিনি। সেই সময়ই জানতে পারেন, মালদা জেলার একটা বড় সমস্যা বাল্যবিবাহ। বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে পরিবারের লোকেরা তাদের বিয়ে দিয়ে দেন। বাল্যবিবাহ রুখতে এবং মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করে তাদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার একাধিক প্রকল্প নিয়েছে। সবুজসাথী, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী প্রভৃতি প্রকল্পের মাধ্যমে মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত এবং স্বনির্ভর করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, মেধা থাকা সত্ত্বেও গ্রাম বাংলার মেয়েরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সেরকম সুযোগ পাচ্ছে না। তাই মেধাবী অথচ প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াও অন্য শিক্ষায় আগ্রহী মেয়েদের নিয়ে এই প্রকল্প তৈরি করেছেন তিনি। নাম দিয়েছেন ‘ম্যাজিক’। magicatmalda ডট কম এই নামে একটি ওয়েবসাইটও খোলা হয়েছে।

গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে শ্যাম সুখী বালিকা শিক্ষা নিকেতনের সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ২০ জন ছাত্রীকে নিয়ে শুরু হয় পথচলা। দিল্লির গুরুগ্রামের দু’জন শিক্ষকের সাহায্যে এই সমস্ত মেয়েরা শিখতে শুরু করে বিভিন্ন কম্পিউটার প্রোগ্রাম এবং সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের কাজ। কম্পিউটারের মাধ্যমে দূর শিক্ষার এই কাজ চলতে থাকে। এখানে মেয়েদের সাহায্য করার জন্য আছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শিরিন খান, এডুকেটেড কোডার হিসেবে আছেন মেঘনা ম্যাডাম। গাইড হিসেবে কাজ করছেন সুশঙ্কর কর্মকার। দারুণ উৎসাহ নিয়ে ছাত্রীরা কাজ শিখতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই ছাত্রীরা নিজেরাই তৈরি করে ফেলেছে বেশকিছু অ্যানিমেশন এবং ভিডিও গেম। এরপরই গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর প্রকল্প নিয়ে তিনি যোগাযোগ করেন গুগলের সঙ্গে। তাঁর প্রকল্প পর্যালোচনা করার পর দারুণ সাড়া পাওয়া যায় গুগলের কাছ থেকে। ভারতে এধরনের প্রকল্প প্রথমবার হাতে নিচ্ছে গুগল।

আরও পড়ুন: চোপড়ার বন্ধ চা বাগানে মাফিয়ারাজ কায়েম, উদ্বেগে বাসিন্দারা

গুগোল কর্তারা জানিয়েছেন, ভারতে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প চালানো হবে। এরপর সারা বিশ্বে নেওয়া হবে এই প্রকল্প। তবে শুধু গুগলই নয়, বিশ্বের অন্যান্য তথ্য প্রযুক্তি সংস্থাগুলিও এই প্রকল্পের দিকে নজর রেখেছে। নবীনবাবু জানালেন, জেলাশাসক দারুণ উৎসাহ যোগাচ্ছেন। পরবর্তীকালে জেলাজুড়ে বিভিন্ন স্কুলের মেয়েদের নিয়ে আরও বড় আকারে এ প্রকল্প চালানো হবে।

সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে এধরনের শিক্ষা লাভ করতে পারায় দারুণ খুশি শিক্ষার্থীরা। সুপ্রিয়া রায়, মেঘা, ভূমিকা সরকার, অভয়া সিংহ’রা বলেছে, ‘বিডিও সাহেব যে উদ্যোগ নিয়ে এই শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন তাতে আমরা অভিভূত। স্কুলের তরফে সুশঙ্কর স্যার, শিরিন ম্যাডাম এবং মেঘনা ম্যাডাম যেমন আমাদের শেখাচ্ছেন তেমনিভাবে মাঝেমধ্যে বিডিও সাহেব এসেও ক্লাস নিচ্ছেন। এছাড়াও দিল্লি থেকে দুজন স্যার এসে আমাদের ক্লাস করাচ্ছেন। এই কয়েক মাসে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। অ্যানিমেশন, ভিডিও গেমের মতো অনেক কিছু শিখেছি। তবে বর্তমানে লকডাউনের জেরে শিক্ষা বন্ধ আছে। আবার কবে থেকে ক্লাস শুরু হবে সেই দিকে তাকিয়ে আমরা।’

গুগলের সাহায্য নিয়ে মালদা জেলার মেধাবী ছাত্রীদের কম্পিউটার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে জেলায় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিপ্লব আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ‘ম্যাংগো ভ্যালি’ থেকে ‘সিলিকন ভ্যালি’তে রূপান্তরিত হতে পারে বলে আশায় রয়েছে মালদা জেলা।