প্রাইভেটে চিকিৎসা করাতে এসে নাজেহাল আমজনতা

165

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : চেম্বারে বা বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখাবেন ভাবছেন। ফি কত জানেন? ভালো হোক বা মন্দ, শিলিগুড়িতে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে এখন পকেটে টান পড়ছে সাধারণ মানুষের। কারও ফি ৫০০ টাকা তো আবার কারও ফি ১,৩৫০ টাকা। তারপর বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা তো আছেই। ডাক্তার দেখানো মানেই তো এক গাদা পরীক্ষানিরীক্ষা। তা সে প্রয়োজন হোক বা না হোক। আপনি পরীক্ষা করাতে যে অর্থ ব্যয় করছেন সেখান থেকে তো ডাক্তারেরও কমিশন রয়েছে। আপনি হয়তো বুঝছেন বিষয়টা, কিন্তু কিছু করার নেই। ডাক্তার বলেছেন, তাই পরীক্ষা আপনাকে করাতেই হবে। তা না হলে তো চিকিৎসাই হবে না। এই পরিস্থিতি এখন শহর শিলিগুড়ির।
শুধু স্থানীয় মানুষই নন, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এই শহরে চিকিৎসার জন্য এসে এভাবেই আর্থিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর চিকিৎসকরা ফি বাড়িয়ে চলেছেন। ইদানীং তো করোনা ভাইরাসকে হাতিয়ার করে প্রায় প্রত্যেকের ফি ২০০-৩০০ টাকা করে বেড়েছে। ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএমএ) শিলিগুড়ি শাখার সম্পাদক ডাঃ শেখর চক্রবর্তী অবশ্য প্রশ্ন তুলতেই বললেন, আমি কিন্তু ফি বাড়াইনি। আগেও যা ছিল এখনও তাই রয়েছে। তবে, করোনা পরিস্থিতির জেরে চিকিৎসা করতে গিয়ে মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই কিট কিনতে হচ্ছে। ফলে হয়তো কেউ কেউ ফি বাড়িয়েছেন। এটা প্রত্যেক চিকিৎসকের নিজস্ব ব্যাপার। দার্জিলিংয়ের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ প্রলয় আচার্য বলেন, ডাক্তারদের ফি বেঁধে দেওয়ার মতো কোনও আইন নেই। এটা প্রত্যেকের মানবিক বিষয়।
শিলিগুড়িতে তিন শতাধিক চিকিৎসক রয়েছেন যাঁরা প্রাইভেট প্র‌্যাকটিস করেন। কেউ ওষুধের দোকানে, কেউ নার্সিংহোম বা বেসরকারি হাসপাতালে, কেউ আবার নিজেই চেম্বার করে রোগী দেখেন। করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর অর্থাৎ গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ চিকিৎসকই প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রশাসনের অনেক আবেদন, নিবেদনের পরও চিকিৎসকদের দিয়ে চেম্বার খোলানো যায়নি। কোভিড পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতেই অর্থাৎ সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করায় শিলিগুড়িতে প্রায় প্রত্যেক চিকিৎসকই চেম্বার করা শুরু করেছেন। তবে, তাৎপর্যপূর্ণভাবে সিংহভাগ চিকিৎসকই রোগী দেখার ফি বাড়িয়ে দিয়েছেন। যে চিকিৎসক ১,০০০ টাকা নিতেন, তিনি এখন ১,৩৫০ টাকা নিচ্ছেন। যিনি আগে ৬০০ টাকা ফি নিতেন, এখন তিনি ৭৫০ টাকা ফি আদায় করছেন। আবার যে চিকিৎসকের আগে ৪০০ টাকা ফি ছিল তিনি এখন ৫০০ টাকা ফি নিচ্ছেন। বিশেষ করে যে চিকিৎসকরা নার্সিংহোমে গিয়ে বহির্বিভাগে রোগী দেখছেন, তাঁদের ফি বেশি মাত্রায় বেড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসকদের একাংশ জানিয়েছেন, নার্সিংহোমগুলোই পিপিই কিট, মাস্ক, স্যানিটাইজারের খরচ হিসাবে বহির্বিভাগের ফি কিছুটা বাড়িয়েছে। এই বাড়তি টাকা চিকিৎসকদের কাছে আসে না। এমনকি এখন আর কোভিড প্রোটোকলও সেভাবে কোনও চেম্বারেই মানা হচ্ছে না। অথচ রোগীদের কাছে বাড়তি ফি আদায় করা হচ্ছে।
এদিন শিলিগুড়ির একটি নার্সিংহোমের বহির্বিভাগের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগী পরিতোষ বিশ্বাস বলেন, হলদিবাড়ি থেকে এসেছি। এখানে ডাক্তারকে কয়েক বছর ধরে দেখাচ্ছি। প্রথম দিকে ৪০০ টাকা ফি দিতাম, এখন ১,০০০ টাকা দিচ্ছি। গত মাস থেকেই ২০০ টাকা বাড়িয়েছেন চিকিৎসক। আমি জিজ্ঞাসা করায় নার্সিংহোম থেকে বলা হচ্ছে, করোনার জন্য ফি বেড়েছে। বৃহত্তর শিলিগুড়ি নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক রতন বণিক বলেন, ডাক্তারিটা একটা পেশা ঠিকই। কিন্তু ডাক্তারদের মানবিকও হওয়া উচিত। এমনিতেই করোনার জেরে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। তার উপরে চিকিৎসকরা নানা বাহানায় ফি বাড়িয়ে দিলে তো মানুষের পক্ষে চিকিৎসা করাও সমস্যার। আমরা চাই চিকিৎসকরা মানবিক হোন, সচেতন হোন।