সুরক্ষিত থাকতে টিকা নিন, সঠিকভাবে মাস্ক পরুন

170

সুরক্ষিত থাকতে টিকা নিন, সঠিকভাবে মাস্ক পরুন| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaডাঃ কল্যাণ খান
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসার, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

একবছর আগে কোভিড-১৯এর ভাইরাস সারস-কোভ-২এর  সংক্রমণ রোখার জন্য আমাদের দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। হঠাৎ লকডাউনে দিনমজুর থেকে পরিযায়ী শ্রমিক, এমনকি সামগ্রিক অর্থনীতি চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আর একারণেই আমরা সময় পেয়ে যাই মহামারির বিরুদ্ধে সঠিক প্রস্তুতি নিতে এবং তাকে সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করতে। ফলে ২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে সংক্রমণ দ্রুত কমতে থাকে। মহামারির বিরুদ্ধে জিতে গিয়েছি ধরে নিয়ে সাধারণ মানুষ মাস্ক ও দূরত্ববিধি থেকে সরে আসেন। এই সময় আবির্ভাব ঘটে ভাইরাসের নতুন স্ট্রেনের ও ডবল মিউট্যান্ট প্রজাতির, যার সংক্রমণ ক্ষমতা পূর্ববর্তী স্ট্রেনের তুলনায় অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি।

- Advertisement -

এ বছর ১৫ ফেব্রুয়ারির পর থেকে কোভিডে সংক্রামিত রোগীর সংখ্যা ফের ঊর্ধ্বমুখী। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার হার কমছে। অ্যাক্টিভ রোগীর অনুপাত আবার বেড়ে পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি, যা কিনা ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ ১.২৫ শতাংশ ছিল। গবেষকদের মতে, কোভিড মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে ভারতে।

বিশেষজ্ঞদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০০ দিন স্থায়ী হবে এই ঢেউ,আর এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় ভাগে শিখর ছোঁবে। ইন্ডিয়ান সারস-কোভ-২ কনসর্টিয়াম  অন জেনোমিকস (INSACOG)-এর দশটা ল্যাবের গবেষণার ফল অনুযায়ী, এখনও অবধি সব রোগীর মাত্র ১৫-২০ শতাংশ নতুন স্ট্রেনের দ্বারা সংক্রামিত। সুতরাং, এখনই বলা যাচ্ছে না দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণ নতুন আবিষ্কৃত স্ট্রেন। বরং আমাদের গাফিলতিই প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ৯০ শতাংশ ভারতবাসী মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সচেতন, কিন্তু আসলে সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করছেন মাত্র ৪৪ শতাংশ।

বিগত শতাব্দীর মহামারি ও বিশ্বের অন্যত্র প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা বলে যে, দ্বিতীয় ঢেউ প্রথম ঢেউয়ে থেকে তুলনামূলক তীব্রতর হবে। যদিও ভ্যাকিসনের উপস্থিতি এবার নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে, অন্তত ভারতের ক্ষেত্রে। ১৬ জানুয়ারি ভ্যাকসিনের প্রয়োগ শুরু হলেও হার্ড ইমিউনিটি সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার কারণে সাধারণ মানুষের সাবধানতা অবলম্বনে অনীহা দেখা যায়। সেইসঙ্গে উৎসব, ভোট প্রচার, অফিস-কারখানা খুলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে কেস বাড়তে শুরু করে।

এই মুহূর্তে বিশেষজ্ঞদের মত, লকডাউন নয়। শুধুমাত্র দ্রুত ও ব্যাপক টিকাকরণই সমস্যার সমাধান করতে পারে। টিকাকরণ সংক্রান্ত দ্বিধা (ভ্যাকসিন হেজিট্যান্সি) পূর্ণমাত্রায় দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে। এর তিনটি কারণ রয়েছে-আত্মতৃপ্তি বা অনীহা, স্বাচ্ছন্দ্য ও আস্থা।

দ্বিতীয় ঢেউ এসে যাওয়ায় আত্মতপ্তি বা অনীহার জায়গা যেমন আর নেই, তেমনই মনে রাখতে হবে, শুধু ভ্যাকসিনের উপস্থিতি নয়, রোগ প্রতিরোধ করে ভ্যাকসিনেশন বা টিকার সঠিক এবং ব্যাপক প্রয়োগ। স্বাচ্ছন্দ্যের কোনও অভাব এই মুহূর্তে নেই। বিনামূল্যে এবং বাড়ির যথাসম্ভব কাছে টিকা পাওয়া যাচ্ছে। কো-উইন অ্যাপের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব। মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে সব তথ্য ও নির্দেশিকা পাওয়াও সহজ। এছাড়া সরকারি হেল্পলাইনে ফোন করে সহজেই জেনে নেওয়া যায়, নিজের অসুখ বা অন্য অসুবিধার কারণে টিকা নেওয়া উচিত বা অনুচিত কিনা। তবে এই সংক্রান্ত ভুল তথ্য বা গুজব সামাজিক মাধ্যমে রয়েছে, যার থেকে দূরে থাকা খুবই প্রযোজন।

যত বেশি টিকাকরণ হবে তত সংক্রমণ কমবে। সংক্রমণ কমলে ভাইরাসের মিউটেশন বা নতুন স্ট্রেন তৈরি হবে না। আর সেটা না হলে এমন স্ট্রেন তৈরি হবে না, যার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী অ্যান্টিবডি বা ভ্যাকসিন কার্যকরী থাকবে না। সুতরাং, আমরা ভ্যাকসিন নিলে শুধু যে দ্বিতীয় ঢেউয়ের তীব্রতা কমবে তা নয়, আমাদের পুনঃসংক্রমণের ভয় কমবে। সেইসঙ্গে আমাদের কাছের মানুষ যাঁরা এখনও ভ্যাকসিন পাচ্ছেন না, যেমন ১৮ বছরের কম বয়সি, গর্ভবতী ও স্তন্যপান করানো মহিলা, তাঁরাও সুরক্ষিত থাকবেন।

অনেকে ভাবছেন, নতুন স্ট্রেনের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কারণে আমাদের শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি যখন কাজ নাও করতে পারে, তখন ভ্যাকসিন নিয়ে কী হবে। এখানে মনে রাখা দরকার, অ্যান্টিবডি কাজ না করলেও আবার কোভিড হলে ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য শরীরে তৈরি হওয়া মেমরি টি-সেল-এর কারণে জটিল অসুখ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা সর্বোপরি মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।

অবশ্যই জানা দরকার, আমাদের দেশে যে দুটো ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে, কোভিশিল্ড ও কোভ্যাকসিন- এগুলির দুটো ডোজ এবং দ্বিতীয় ডোজের দুসপ্তাহ পরে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়া শুরু হয়। চার সপ্তাহ পরে সম্পূর্ণ সুরক্ষা প্রদানকারী অ্যান্টিবডি আমরা পাই। যেহেতু এখনও এটা প্রমাণিত নয় যে, এই অ্যান্টিবডি অসুখের সংক্রমণ রোধ করে, সেহেতু এরপরেও মাস্ক, শারীরিক দূরত্ব ও অন্যান্য বিধি মেনে চলা অবশ্য কর্তব্য।

যে কোনওরকম উপসর্গ দেখা দিলে অতি অবশ্যই আরটি-পিসিআর টেস্ট করা এবং নিজেকে আইসোলেট করা প্রয়োজন। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, সব টেস্টের ৭০ শতাংশ বা তার বেশি আরটি-পিসিআর হওয়া (র্যাপিড অ্যান্টিজেন- ৩০ শতাংশ বা তার কম) প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতি পজিটিভ রোগীর কমপক্ষে ৩০ জন ক্লোজ কনট্যাক্টকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত করে টেস্ট করা ও সঠিক চিকিৎসা করা বাধ্যতামূলক, বিশেষ করে সেই সব অঞ্চলে যেখানে রোগীর সংখ্যা ঊর্ধমুখী।

ইংল্যান্ডে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া প্রতি ১০ জন কোভিড রোগীর মধ্যে ৭ জন পাঁচ মাস পরেও সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারছেন না। তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশ মানুষ অন্তত একটা উপসর্গ অনুভব করছেন, যা তাঁরা কোভিডের আগে অনুভব করেননি।

তথ্য অনুযায়ী, দশটা সবচেয়ে বেশি দেখা দেওয়া উপসর্গের মধ্যে রয়েছে, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা, শারীরিক শিথিলতা, ঘুমের অসুবিধা, গাঁটে ব্যথা ও ফোলা, হাত-পায়ে দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, স্মৃতিভ্রংশ এবং সঠিক বা দ্রুত চিন্তা করার শক্তি কমে যাওয়া। সরকার যখন নির্দেশ দিচ্ছে, তখন সেই সময় টিকা নিয়ে নিলে এইসব কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ।

দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমাদের দেশে ২৫ লক্ষের বেশি মানুষ সংক্রামিত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ভ্যাকসিন তাঁদেরই আগে দেওয়া হচ্ছে যাঁদের প্রয়োজন বেশি, মানে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি। যেমন, ১০ মিলিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী ও ২০ মিলিয়ন প্রথম সারির যোদ্ধাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ভ্যাকসিনের দুটো ডোজ দেওয়া হয়েছে যথাক্রমে মাত্র ৫.২ এবং ৩.৯ মিলিয়ন। ২০২০ সালে যেখানে ভারতীয় সেনা মারা গিয়েছেন ১০৬ জন, সেখানে কোভিডে সংক্রামিত হয়ে শুধু ডাক্তার মারা গিয়েছেন ৭৩৪ জন, অর্থাৎ ৭ গুণ। এই মুহূর্তে প্রতি ১,৩৪৩ জন ভারতীয়র জন্য একজন ডাক্তার আছেন। ৭৩৪ জন চিকিত্সকের মৃত্যুতে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ ডাক্তারহীন। দ্বিতীয় ঢেউয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে রোগীর সংখ্যা বাড়লে। তাই শীঘ্রই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত স্তরে ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাতে শুধু কোভিড নয়, অন্যান্য জটিল বা আপৎকালীন অসুখের চিকিত্সায় সমস্যা দেখা দেবে।

এখনও পর্যন্ত ৯০ শতাংশ মৃত্যু দেখা গিয়েছে ৪৫ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষের মধ্যে। তাই তাঁদের টিকাকরণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন। কোনওরকম কোমরবিডিটি যেমন, ডায়াবিটিস, হাইপারটেনশন, কিডনির অসুখ, শ্বাসযন্ত্রের অসুবিধা ইত্যাদি টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নয়। বরং কোমরবিডিটি থাকলে তাঁদের আগে টিকা নেওয়া আবশ্যক। ষাটোর্ধ্ব মানুষের ৩০ মিলিয়ন এবং ৪৫-৬০ বছরের মানুষ যাদের কোমরবিডিটি আছে, তাঁদের ৮ মিলিয়ন মানুষ এখনও অবধি টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন।

সব মানুষ সচেতনভাবে টিকা নিতে আগ্রহ দেখালে এবং দেশ হিসেবে আমাদের দিনে ৪-৫ মিলিয়ন (এখন ২ থেকে ৩ মিলিয়ন)  টিকা প্রদানের ক্ষমতা ব্যবহার করলে আগামী চার মাসে ৪৫ ঊর্ধ্ব সব মানুষ সুরক্ষিত হয়ে যাবেন। ফলে দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্ষতি বা মৃত্যুর পরিমাণ বহুলাংশেই কমানো সম্ভব হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কোনও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না নিলে একজন কোভিড সংক্রামিত রোগী ৩০ দিনে ৪০৬ জনকে সংক্রামিত করতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে সংক্রামিত রোগী যদি আইসোলেশনে থাকেন এবং দূরত্ববিধি মেনে চলেন, তাহলে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানো রোখা যাবে।

পরিশেষে বলতে দ্বিধা নেই যে, দ্বিতীয় ঢেউয়ে গতিপ্রকৃতি আমাদের কার্যকলাপের ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত স্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সঠিকভাবে নেওয়া এবং সমষ্টিগত স্তরে সঠিক সময়ে টিকাকরণ আমাদের কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রক্ষাকবচ।