স্বজন হারালেও টিকা আসায় স্বান্তনা

সানি সরকার, শিলিগুড়ি: একদিকে উল্লাস। অন্যদিকে আক্ষেপ, যন্ত্রণা। করোনা প্রতিরোধক ভ্যাকসিন হাতের নাগালে চলে আসায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ, সবস্তরেই খুশির হাওয়া। স্বস্তির নিঃশ্বাস সব মহলেই। কিন্তু এই খুশির আবহেও ওঁদের চোখে জল। ভ্যাকসিনটা আর কিছুদিন আগে এলে এভাবে কি প্রাণ কেড়ে নিতে পারত করোনা? ভ্যাকসিন নিয়ে যত হইচই হচ্ছে, ততই যেন পরতে পরতে এই যন্ত্রণা বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে প্রাণঘাতী ভাইরাসে চিরঘুমে চলে যাওয়া মানুষের পরিজনদের। তবে স্বজন হারিয়েও ভ্যাকসিন চলে আসায় বহু মানুষের যে প্রাণ বাঁচবে, সেই কথা ভেবে অনেকে সান্ত্বনা খুঁজছেন।
লড়াইটা শুরু হয়েছিল গত বছরের মার্চ মাস থেকে। এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে অনেককে। করোনায় মৃত্যুর হার ভয়ংকর না হলেও নেহাত কমও নয়। তাই গোটা বিশ্বের সঙ্গে এদেশের মানুষও চাতক পাখির মতো ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কোভিড যুদ্ধে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ শুরু হয়েছে শনিবার। প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে মানুষের সাড়া ভালোই মিলেছে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হতেই স্বজন হারানো বেদনা নতুন করে চাগাড় দিয়ে উঠেছে অনেকের। ২৩ জুন করোনায় মারা যান কলেজপাড়ার বাসিন্দা বিমল পাল। পরিবারকে না জানিয়ে বিমলবাবুর মৃতদেহ সৎকারের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সেই বিতর্কে এখন আর মন নেই বিমলবাবুর ছেলে শুভজিতের। বরং ভ্যাকসিনটা কেন আগে এল না, এই আক্ষেপ প্রতিনিয়ত দগ্ধ করছে তাঁকে। শুভজিৎ বলেন, মার্চ মাসের গোড়া থেকেই এখানে করোনার প্রকোপ শুরু হয়। চারমাসের মধ্যেও ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। তা যদি হত তাহলে আমার বাবার প্রাণটা এভাবে চলে যেত না। আক্ষেপ তো থাকবেই। সময় মতো ভ্যাকসিন না পাওয়ার দুঃখ রয়েছে শিলিগুড়ির হোটেল ব্যবসায়ী বিপ্লব ঘোষেরও। কিন্তু বাস্তবটা উপলব্ধি করতে পারছেন তিনি। ২৯ সেপ্টেম্বর করোনা কেড়ে নেয় তাঁর মা পীতবালা ঘোষের প্রাণ। বিপ্লব বলেন, আগে এলে অবশ্যই ভালো হত। মা-কে হারাতে হত না। কিন্তু এমন একটি রোগের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। ফলে কিছুটা তো সময় লাগবেই।
করোনা সংক্রামিত হয়ে মারা যান অরুণা দত্ত। তাঁর ছেলে রিন্টু দত্ত বলেন, কী আর হবে? এখন ভেবে তো কিছু করার নেই। ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে। কোভিডে মারা গিয়েছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডাঃ রাজীব গণচৌধুরী। তাঁর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের চিকিৎসকদের হয় তো রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু এখানকার অনেক চিকিৎসকই আত্মীয় বিয়োগ হিসেবে দেখেন রাজীববাবুর মৃত্যুকে। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজিক্যাল বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসার ডাঃ কল্যাণ খান বলেন, ওঁর সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমন একজনের মৃত্যু মানা যায় না। ভ্যাকসিনটা আগে পাওযা গেলে তাঁর মতো অনেককেই হয় তো আমাদের হারাতে হত না। করোনার জন্য মামা কল্যাণ সেনগুপ্তকে হারিয়েছেন মেডিকেল কলেজের ডিন ডাঃ সন্দীপ সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন আগে এলে নিশ্চয়ই মামাকে বাঁচানো যেত। কিন্তু বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় কিছুটা হলেও বাস্তবটা বুঝতে পারছি। তাই আক্ষেপের জায়গা নেই। মৃত্যুর তালিকায় নাম উঠেছে নারায়ণ বণিকেরও। কিন্তু ভ্যাকসিন এলে কী হত তা নিয়ে এখন আর ভাবতে চাইছেন না তাঁর ছেলে সঞ্জয় বণিক।