দেবী দুর্গার নাম-রূপরহস্য

850

দীপিতা চ্যাটার্জী: মা দুর্গা মানেই কি শুধুই মহিষাসুর মর্দিনী রূপ? দেবীর সেই রূপের সৃষ্টির কথা আমরা অনেকেই জানি না। জানা নেই অনেক অজানা তথ্য।

গোলকপতি হরি সর্বক্ষমতার অধিকারি। হরি যখন সৃষ্টির কথা ভাবলেন তখন তার বাম পাশ থেকে সৃষ্টি হল বামা অর্থাৎ রাধা, জ্ঞানের প্রতি যিনি ব্যাকুল তিনিই হলেন রাধা। এই রাধা থেকেই ভগবতীর সৃষ্টি। আবার ভগবতী থেকেই সৃষ্ট সমস্ত স্ত্রী শক্তির। পুরুষ, পুরুষাকারে সৃষ্টি করতে গেলে নারী শক্তির সমন্বয় প্রয়োজন। নারী ছাড়া সৃষ্টি, স্থিতি, লয় কোনোটাই পুরুষ একাকী করতে পারে না। তাই নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। পুরুষহীন নারীও অচল।

- Advertisement -

কল্পিত রূপ: সাক্ষাৎ ভগবতী যখন গায়িত্রী রূপ নিলেন, সেখান থেকেই কল্পিত দেবী দুর্গার। যখন সমস্ত অশুভ শক্তির প্রাচুর্য্য ঘটে ও সর্বশক্তিমান হিসেবে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শিত হয় তখন একটা বিন্দুতে গিয়ে ধ্বংসের সময় আসে। অসহনীয় অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে সর্ব দেবতারা বিষ্ণুর স্মরণাপন্ন হয়। তখন ত্রীদেব ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, যোগমায়া অর্থ্যাৎ মায়া থেকে মা দুর্গার সৃষ্টি করেন। সৃষ্টি, স্থিতি, লয় এই রক্ষার্তে দেবী কে রূপায়িত করা হয়। যা আমরা মহালয়ার চন্ডীপাঠে শুনে থাকি। মধুকৈটব,দনু ও মহিষাসুর এই তিন অসুর কে ছয় আট ও দশ হাতে বধ করে দেবী সমগ্র স্বর্গ মর্ত ও পাতাল জয় করে দেবতা ও মানবকুলের বসবাসের জন্য উপহার দিলেন পৃথিবী কে।

শুরুর পূজা: সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য আমরা দুর্গা কে স্মরণ করি। লংকাধিপতি রাবনকেও আমরা অশুভ শক্তি হিসেবে গণ্য করি। কিন্ত তিনি শক্তিরূপে দেবী দুর্গা কে পুজো করতেন। রাবন বাসন্তী পূজা করতেন, বসন্তকালে। যার অকাল বোধন করেন রাম। রাবন কে বধ করতে গেলে চন্ডির পূজা করতে হবে, শক্তি রূপে। কিন্ত চন্ডীর সংকল্প এমন একজন ব্রাহ্মণকে করতে হবে যার গায়িত্রী কখনো অশুদ্ধ হয় নি। স্বয়ং ব্রহ্মার গায়িত্রী স্খলন হয়েছিল। একমাত্র রাবনের গায়িত্রী শুদ্ধ ছিল। বিভীষণের উপদেশ মতো রাম রাবন রাজকে অনুরোধ জানালে তিনি রাজি হয়েছিলেন চন্ডী বসাতে। সংকল্প করার সময় রাবন রাম কে জিগ্যেস করেছিলেন সংকল্পের কারণ। উত্তরে রাম বলেছিলেন, রাবন বধ হেতু। এ কথা শোনার পরও রাবন চন্ডী বসিয়েছিলেন। রাম চন্ডী পূজা করে শক্তি অর্জন করেন ও রাবনরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন। এই পূজাই দুর্গা পূজা নামে প্রচলিত।

দেবী নানা সময়ে নানা রূপে পূজিত। কখনো মহাদুর্গা , চন্ডিকা আবার কখনো অপরাজিতা। চন্ডিকাও দুই রূপে পূজিত, চন্ডী ও চামুন্ডা। চামুন্ডা কালি রূপে চন্ডা ও মুন্ডা এই দুই অসুরকে বধ করেন। মহাদুর্গার আবার তিনটি রূপ-উগ্রচন্ডা, ভদ্রকালী ও কাত্যায়নি। কাত্যায়নি দুর্গাই নবদুর্গা নামে পূজিত। দুর্গা নামের মধ্যেই শক্তি প্রতিফলিত। নবরাত্রিতে দুর্গা নটারূপে পূজিত হয়। শৈল্যপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রাঘন্টা, মা কুষ্মন্ডা, মা স্কন্ধমাতা, কাত্যায়নি, কালরাত্রি, মহাগৌরী, সিদ্ধিদাত্রী।

অস্ত্রের সাতকাহন: হিন্দুদের আরাধ্যা দেবী দুর্গা। শক্তিরূপে, ভক্তিরূপে, মাতৃরূপে পূজিত দেবী। মহাদেবের অর্ধাঙ্গিনী। ভগবান শিব যে আকারই ধারণ করেন তাতে অভিব্যক্তি থাকে দুর্গার। দুর্গ রক্ষা করেন যিনি তিনিই দুর্গা। সমস্ত মানব শরীরে দেবতার বাস। শরীরকে কে যদি দুর্গ কল্পনা করা হয় তবে তাকে দশ দিক দিয়ে রক্ষার জন্য দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র দশ দিশায় নির্দেশিত। প্রতিটি অস্ত্র অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে ভক্তদের।

শঙ্খ: পুরাণ মতে জীব জাতির সমস্ত প্রাণের সৃষ্টি শঙ্খের ধ্বনি থেকে। সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে শঙ্খ প্রদান করে বরুন দেব।

চক্র: মা দুর্গার আঙ্গুলে ঘোরে চক্র, যার অর্থ বহন করে- দেবী দুর্গা সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রে রয়েছেন এবং তাকে কেন্দ্র করে সমস্ত বিশ্ব আবর্তিত হচ্ছে। বিষ্ণুদেব দান করেন চক্র।

পদ্ম: পাঁকে জন্মানো পদ্মও কত সুন্দর। ঠিক তেমন ভাবেই মায়ের আশীর্বাদেও অসুরকুলের যত অন্ধকার ও অশুভ শক্তি বিনাশ হয়। পদ্ম এই বার্তাই বহন করে। প্রজাপতি ব্রহ্মা দান করেন।

খড়্গ: মানুষের বুদ্ধির ধারের সাথে তুলনা করে বলা হয় এই ধার দিয়েই যেন সমাজের সমস্ত বৈষম্য ও নেতিবাচক ভাবনাকে মানুষ জয় করতে পারে। এই বার্তাই বহন করে খাঁড়া। দান করেন সিদ্ধিদাতা গণেশ।

ধনুর্বাণ: শক্তির প্রতীক হলো তীর ধনুক। তীর বিভব শক্তির চিহ্ন। ধনুক গতি সম্পর্কিত শক্তির চিহ্ন হিসেবে বার্তা বহন করে। বায়ুদেব দেবীকে দান করেন তীর ধনুক।

ত্রিশূল: মহেশ্বর ত্রিশূল দান করেন দেবী কে। এই ত্রিশূলের তিন ফলা ভিন্ন অর্থ বহন করে। মানুষের ত্রিগুনের সমন্বয়ে তৈরী যথা তমঃ, রজঃ, সত্য। ত্রিশূলের এই তিন গুণকেই নির্দেশ করে তিনটি বিন্দু অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে চিত্রিত করে। মাঝের ফলা আত্মাকে চিহ্নিত করে। অতীত অতিবাহিত, ভবিষ্যৎ অজানা তাই বর্তমানই সবার ওপরে।

দণ্ড বা গদা: আনুগত্য, ভালোবাসাও ভক্তির প্রতীক হিসেবে দেবী কে দান করেন বিষ্ণু।

অশনি: দৃঢ়তা ও সংগতির প্রতীক হিসেবে দান করেন ইন্দ্রদেব। এই দুই গুনেই মানুষ জীবনে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে।

অগ্নি: জ্ঞান ও বিদ্যার প্রতীক হিসেবে অগ্নিদেব এই অস্ত্র দান করেন।

সাপ: চেতনার নিম্নস্তর থেকে উ্চ্চস্তরে প্রবেশ ও বিশুদ্ধ চেতনার চিহ্ন এই সাপ। মহাদেব দান করেন।

দুর্গা ছিলেন বৈষ্ণবী। বৈষ্ণবী হলো বিষ্ণুর অবতার। প্রনাম মন্ত্রে বলা হয় ‘নারায়ণী নমস্তুতে’। কারণ নারায়ণ থেকে জাত। তাই শঙ্খ চক্র গদা পদ্ম যে কোনো সংহারকারী দেবীর হাতে থাকবেই।

মা দুর্গার বাহন হলো সিংহ। যা আমাদের কারোর অজানা নয়। সিংহ ক্ষমতার প্রতীক। আর মা দুর্গা সেই ক্ষমতার ওপর বিরাজ করেন সর্বশক্তি রূপে।

মা দুর্গাকে এয়ম্বকে নামে জানা যায়, তাঁর ত্রিণয়নের জন্য। ত্রিনয়ণ সূচিত করে অগ্নি, সূর্য্য ও চন্দ্র কে। মহাশক্তি রূপে বিরাজমান। দুর্গা মনে অপরাজিত।

দেবীকে সৃষ্টির সময় অনেক দেবতা অনেক অস্ত্র দিয়েছিলেন। কিন্ত সব অস্ত্র দশ হাতে দেখানো সম্ভব নয় বলে কিছু অস্ত্রই দেখানো হয়। তবে বংশ অনুযায়ী এই অস্ত্র পরিবর্তনও হয়। তবে বারোয়ারী মতে এই অস্ত্র গুলোই ব্যবহার করা হয়। কালিকা পুরান মতে এখন সব পুজো হয়।

সব অশুভ শক্তির বিনাশকারি দেবী এই মহামারী থেকেও পৃথিবীকে রক্ষা করবে এই আশা নিয়েই ক্লান্ত পৃথিবী এখন অপেক্ষায়। এক ভয়হীন শান্তি পাঠে. . .

ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিং শৃণুয়াম দেবাঃ।
ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্য জত্রাঃ
স্থিরৈঃ অঙ্গৈঃ তুষ্টু বাংসঃ তনুহভিঃ।
ব্যশেম দেবহিতং যৎ আয়ুঃ।
ওঁ স্বস্তি নো ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ।
স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্বদেবাঃ।
স্বস্তি নোস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ।
স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ