রাজ্যপাল ও রাজ্য, দুপক্ষই অনর্থক ক্রিজ ছেড়ে খেলতে চাইছে

86
প্রতীকী ছবি

দেবদূত ঘোষঠাকুর  

তিনি তাঁর অন্যতম একজন পূর্বসূরি গোপালকৃষ্ণ গান্ধির মতো তাত্ত্বিক প্রবন্ধ লিখতে পারবেন কি না জানি না, কিংবা কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর মতো কবিতা। তবে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্র নিয়ে দিব্যি হাজার হাজার শব্দ নিশ্চয়ই লিখে ফেলতে পারবেন জগদীপ ধনকর। তাঁর কার্যকালের তৃতীয় বছর চলছে এটা। এর মধ্যেই শীতলকুচি থেকে নন্দীগ্রাম, দার্জিলিং থেকে সাগর, পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে যেভাবে তিনি সফর করেছেন, সেই যাত্রার যথাযথ বর্ণনা থাকলেই পর্যটক-সাহিত্যিক হিসেবে ভবিষ্যতে উচ্চারিত হতে পারে ধনকরের নামও।

- Advertisement -

সামনেই পুরসভা নির্বাচন, পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্ব। তৃণমূল সরকারের রাজধর্ম নিয়ে ধনকরের যা উপলব্ধি, তাতে অনেকবার সন্ত্রাসের অভিযোগ তাঁর কাছে জমা পড়বেই। আর ধনকরও ছুটবেন সেখানে। আরও গ্রাম-শহর দেখা হয়ে যাবে তাঁর। রাজভবনের এক প্রবীণ কর্মীকে বলতে শুনলাম, এখনই ধনকরকে বাংলার সব থেকে সক্রিয় রাজ্যপালের তকমা দিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরির দিন রাজভবনে দীর্ঘদিন কাজ করা এক অবসরপ্রাপ্ত আমলার ব্যাখ্যা, এই রাজ্যপালের রিঅ্যাকশন টাইম (প্রতিক্রিয়া জানানোর দ্রুততা) সব থেকে বেশি। সচিবালয়ে কোনও প্রয়োজন নেই। কোনও ঘটনার কথা কানে এলেই টুইটারে ছুটে যাবে তাঁর বার্তা। বুঝিয়ে দেবেন, রাজভবন কিন্তু সব নজরে রাখছে।

আবার অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতার মতো অধিকাংশ আমলা মনে করেন, রাজ্যপালের পদের মর্যাদা নিয়ে এমন ছেলেখেলা অতীতের কোনও রাজ্যপালই করেননি। রাজ্যপালের ব্যক্তিগত দুর্নীতি নিয়ে পর্যন্ত প্রকাশ্যে সরব রাজ্যের শাসকদলের এক সাংসদ। আর কোনও রাজ্যপালকে এই রাজ্যে এমন হেনস্তা হতে হয়নি। এরপরেও রাজ্যপাল নিজেই টুইট করে সাংসদের অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। এটা কি রাজ্যপালের কাজ? তাঁর একটা বড় সচিবালয় রয়েছে, বিবৃতি দিতে হলে তারা দেবে। কিংবা আইনজীবীর নোটিশ যাবে। কিন্তু রাজ্যপাল ঝগড়া করতে রাস্তায় নেমে পড়বেন, এটা আগে কখনও ভাবা যায়নি।

আমরা যখন সাংবাদিকতা পেশায় এসেছি, আমাদের রাজ্যপালের কাজ সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছিল। রাজ্যপালের ভূমিকার সঙ্গে ব্রিটেনের রানির ভূমিকার তুলনা চলে। তিনি শুনবেন বেশি, বলবেন কম। যদি কিছু বলার থাকে তা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে লিখে জানাবেন। রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়াটাও রাজ্যপালের পদের কাছে মর্যাদাহানিকর। রাজ্যপালকে মনে রাখতে হবে মুখ্যমন্ত্রীই রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি নন। বছর চার আগেও রাজ্যপালের কোনও কোট পাওয়া যেত না। রাজভবন থেকে রাজ্যপালের সচিবের ছাপানো বিবৃতি আসত। তার জন্য রাজভবনের জনসংযোগ অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হত। বড় হ্যাপা ছিল। এখন ব্যাপারটা অনেক সরল। এই রাজ্যপালের রাজ্যের বাছাই করা সাংবাদিকের ফোন নম্বর নিয়ে একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। টুইটার তো আছেই।

এই রাজ্যপাল একেবারে হাতের নাগালে। সহজলভ্য। সম্প্রতি এক প্রাক্তন সহকর্মীর মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে বেঙ্গল ক্লাবে গিয়েছি। শুনলাম সেখানে রাজ্যপাল নিমন্ত্রিত। অতীতে এভাবে নিমন্ত্রণ পেলেও কোনও রাজ্যপাল তা গ্রহণ করেছিলেন কি না জানি না। ধনকর কিন্তু সেখানে গেলেন এবং উপস্থিত সব সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ করলেন। যেন জনসংযোগ অভিযানে। এটা রাজনৈতিক নেতাদের মানায়। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক নেতা যখন রাজ্যপাল হয়ে বসেন, তাঁর পক্ষে সেটা বেমানান।

আমরা রাজ্যপাল হিসেবে বীরেন জে শাহ, নুরুল হাসান, গোপালকৃষ্ণ গান্ধি, এমকে নারায়ণনের মতো ব্যক্তিত্বদের পেয়েছি, যাঁরা এই পদের আভিজাত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। রাজ্য সরকারের সঙ্গে শাসকদলের সংঘাতের শুরু সেই ১৯৬৭ সালে। কিন্তু কখনও সেই সংঘাত এমন কলতলার ঝগড়ার স্তরে নেমে আসেনি। ১৯৬৭-তে রাজ্যপাল ধর্মবীরের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের সংঘাত বহু আলোচিত। রাজ্যপাল নতুন সরকারকে বরখাস্ত করার জন্য দিল্লিকে সুপারিশ করেন। ১৯৬৯ সালে ফের ক্ষমতায় আসে যুক্তফ্রন্ট। বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণ। ওই ভাষণ রাজ্য সরকার লিখে দেয়। এটাই দস্তুর। ওই ভাষণে সরকারের তরফে লিখে দেওয়া হয়, আমি অন্যায়ভাবে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙেছিলাম। ধর্মবীর কিন্তু ভাষণের ওই অংশটা পড়েননি। পরে অবশ্য জ্যোতি বসুরা দিল্লিতে দরবার করায় ধর্মবীরকে চলে যেতে হয়। ধর্মবীর গেলেন। এলেন শান্তিস্বরূপ ধবন। ১৯৭১ নির্বাচনে  বামেরা ১১৩ আসন পায়। কংগ্রেস ১০৫। কিন্তু  ধবন কংগ্রেসকে সরকার গড়তে ডাকেন।  জ্যোতিবাবু বলেন, ধবনের ধারাপাতে ১১৩-র চেয়ে ১০৫ বড়।

বামফ্রন্ট আমলে আরেক রাজ্যপাল ভৈরব দত্ত পান্ডেকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত ডাকতেন বাংলা দমন পান্ডে। ১৯৮৪ সালে রাজ্যপাল এপি শর্মার সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের বিরোধ চরমে ওঠে। যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদের প্যানেল থেকে তিনি রমেন পোদ্দারের বদলে বেছে নেন সন্তোষ ভট্টাচার্যকে। বামপন্থী কর্মী ইউনিয়ন দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে দেননি সন্তোষবাবুকে। পাশাপাশি রাজ্যপালের অনুষ্ঠান বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয় সিপিএম। বামফ্রন্টের শেষ পাঁচ বছরের শাসনকালে গোপালকৃষ্ণ নন্দীগ্রামের ঘটনাকে হাড়-হিম সন্ত্রাস বলে মন্তব্য করে পরোক্ষে বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সুবিধা করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু রাজভবন তখনও পর্যন্ত সম্ভ্রমের জায়গা ছিল।

সিপিএম সবসময়ে মনে করে এসেছে যে রাজ্যপালের পদটাই অযৌক্তিক। তাই অনেক ক্ষেত্রে যেচে রাজ্যপালের সঙ্গে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করেছে। ৩৪ বছরের বাম জমানায় মাত্র তিনজন রাজ্যপাল মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিলেন। রঘুনাথ রেড্ডি, বীরেন  জে শাহ, গোপালকৃষ্ণ গান্ধি। নতুন জমানার ১০ বছরে নারায়ণন, কেশরীনাথ দুজনেই তাঁদের মেয়াদ সম্পূর্ণ করেছেন। সরকারের সঙ্গে নানা মতপার্থক্য সত্ত্বেও।

গার্ডেনরিচের একটি কলেজে ২০১৩ সালে  ছাত্র সংসদের নির্বাচন ঘিরে দুষ্কৃতীদের গুলিতে পুলিশ অফিসারের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান রাজ্যপাল নারায়ণন। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশে পুলিশ কমিশনার পচনন্দার বদলি নিয়ে সরব হন রাজ্যপাল। মমতা এই মন্তব্যকে রাজ্যপালের অধিকার বহির্ভূত বলে সরব হন। কেশরীনাথ মমতার বিরাগভাজন হন সাম্প্রদাযিক দাঙ্গা রুখতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে।

রাজ্যপাল হিসেবে শপথ নেওয়ার আড়াই মাসের মধ্যে তাঁর উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দেন ধনকর। বাবুল সুপ্রিয়কে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ধার করাই হোক, শিলিগুড়িতে প্রশাসনিক বৈঠকে রাজ্যের আমলাদের অনুপস্থিতি নিয়ে সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করাই হোক-ধনকর সব সময়ে খেলেছেন ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এসে। তৃণমূলও তার জবাব দিয়েছে পালটা ক্রিজ ছেড়ে। তাতেই খেলা সংঘর্ষপূর্ণ হয়েছে। লক্ষ্মণরেখা ছাড়িয়েছে দুই পক্ষই। শাসকদল, রাজ্য সরকার এবং রাজ্যপাল কেউই মীমাংসার পথে এগোতে চাইছে না। রাজ্যপাল ঠিক করেই রেখেছেন, তিনি এই সংঘাত কমানোর রাস্তায় হাঁটবেন না। বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি আরও বিস্ফোরক হচ্ছেন। যেটা তাঁর পদের পক্ষে শোভন নয়।

আসলে ধনকর বুঝে গিয়েছেন, প্রচারমাধ্যমের আলোয় থাকতে গেলে তাঁকে আরও বেশি করে বিতর্কে থাকতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে মেয়াদ ফুরিয়ে আসার আগেই পরবর্তী পদের যোগ্য করে তুলতে হবে যে! কাজ ছাড়া যে তিনি বসে থাকতে পারবেন না, তা ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন ধনকর।

(লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক)