রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ চলছে, আইনের রাজনীতিকরণ হচ্ছে: রাজ্যপাল

247

বর্ধমান: রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ চলছে। আইনের রাজনীতিকরণ হচ্ছে। একজন সরকারি ব্যক্তি রাজনৈতিক কাজ করতে পারেন না। সোমবার দুপুরে বর্ধমান সার্কিট হাউসে এক সাংবাদিক বৈঠকে এভাবেই রাজ্য সরকারের সমালোচনা করলেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর। পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এদিন বেলায় বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পুজো দেওয়া শেষ করে সস্ত্রীক রাজ্যপাল চলে যান বর্ধমান সার্কিট হাউসে। সেখানে দীর্ঘক্ষণ সাংবাদিক বৈঠক করেন রাজ্যপাল।

সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন রাজ্যপাল। তিনি বলেন, ‘রাজ্যপাল পদে দায়িত্ব নেবার পর একবার পূর্ব ঘোষণা ছাড়া বর্ধমানে এসেছিলাম। তৎকালীন সময়ে পূর্ব বর্ধমানের জেলাশাসক ছিলেন বিজয় ভারতী। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে বর্ধমান সার্কিট হাউসে চলে এসেছিলেন। ওঁনার আনা বর্ধমানের দুই প্রসিদ্ধ মিষ্টি সীতাভোগ ও মিহিদানা আমি তৃপ্তি খেয়েছিলাম।’ বিজয় ভারতীর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা প্রসঙ্গে রাজ্যপাল বলেন, ‘রাজ্যের একমাত্র জেলাশাসক বিজয় ভারতী দেখা করতে এসেছিলেন। হয়তো সেই সময়ে বিজয় ভারতীর কাছে উপর মহলের নির্দেশ আসেনি। তাই তিনি এসেছিলেন।’ জগদীপ ধনকর বলেন, ‘রাজ্যপালকে অসম্মান মানে সিস্টেমের অপমান। ডায়মন্ড হারবারে রাজ্যপালকে গার্ড অফ অনার পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে তার উত্তর চেয়েছি। কারণ সংবিধান রক্ষার শপথ ও জনতার সেবা করার শপথ নিয়েছি।’

- Advertisement -

দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে রাজ্যাপাল বলেন, ‘আন্দামান নিকোবরে সবচেয়ে বেশি বাঙালিরাই বন্দি ছিলেন। বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত এই জেলার সন্তান। তিনি ছিলেন ভগৎ সিংয়ের সহযোগী। মৃত্যুর পরেও দুই বিপ্লবীর সমাধিক্ষেত্র তৈরি হয় একই জায়গায়। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার পর কবিগুরু তাঁর উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। আর আজ কিছু লোক সংবিধানের আত্মাকে মানছেন না। অন্য রাজ্য থেকে কেউ এলে তাঁকে বহিরাগত বলা হয়। এর নিন্দা করছি।’ জগদীপ ধনকর জানান, তাঁর সংকেত মুখ্যমন্ত্রীর দিকে। কারণ এই কার্যকলাপ তাঁকে দুঃখ দেয়। এই বাংলার বিবেকানন্দ গোটা দুনিয়াকে অভিভূত করেছিলেন। সবদিক থেকে এগিয়ে এই এলাকা। দেশের অখণ্ডতাকে এখন লঘু করার প্রয়াস চলছে।’

আমপান ঝড়ের প্রসঙ্গ তুলে রাজ্যপাল বলেন, ‘রাজ্যকে আমপানে সাহায্য করেছে কেন্দ্র। সেই ত্রাণ বিলি করাতেও অনিয়ম হয়েছে। পাকা বাড়ির মালিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এতেও চুরি? দুর্গত মানুষের সহায়তায় বেনিয়ম? এই ধরনের ভুলের তদন্ত হওয়া উচিত। মহামারীর সময়েও ঠিক কাজ হয়নি। ভুলের উপর আবরণ দেওয়া হচ্ছে।’ এইসব নিয়ে আজ অবধি যে প্রশ্ন করেছিলাম তা নিয়ে কোনও রিপোর্ট পাইনি। এই রিপোর্ট চাওয়া উচিত মিডিয়ার। রাজ্যপালের দাবি, রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ চলছে। আইনের রাজনীতিকরণ হচ্ছে। একজন সরকারি ব্যক্তি রাজনৈতিক কাজ করতে পারেন না। সংবাদমাধ্যম চুপ করে থাকলে খারাপ লাগে। রাস্তার হাল কি আপনারা জানেন। এখানে গণবণ্টন ব্যবস্থারও রাজনীতিকরণ হয়েছে বলেও দাবি করেন রাজ্যপাল।

রাজ্যপাল প্রশ্ন তোলেন, ‘প্যাড পার্টি কী? শুনে চকিত হয়েছি। দুই প্রতিনিধিদল আমাকে এ বিষয়ে সবিস্তার জানিয়েছে। কেন্দ্রের বিধি এখানে কার্যকর হয়নি। কার্যত সমান্তরাল সরকার চলছে। বালি, পাথর, কয়লায় স্লিপ চলছে। এটা সিন্ডিকেটের বাজে উদাহরণ। এটা মাফিয়াগিরি। ওই রসিদ অর্থাৎ প্যাডের টাকা কোথায় যায়, তার সব প্রকাশ্যে আসবে। যাঁরা ভাবেন আইনের হাত লম্বা নয়, তাঁরা অচিরেই সব বুঝতে পারবেন। নীচের তলার পুলিশ চাপের মুখে পড়ে এইসব কাজ করতে বাধ্য হন। কঠোর পরিশ্রম করেও তাদের চাপে পড়তে হয়। দুর্নীতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে। কিষানরা গোটা দেশে সরাসরি ১৪ হাজার টাকা পান। বাংলার ৭০ লক্ষ চাষি এই সহায়তা পাননি। ৯৮০০ কোটি টাকা পাননি এ রাজ্যের মানুষই। মিডিয়া কেন তোলেনি এ প্রসঙ্গ? এটা একটা অনুদান। ব্যারাকপুর কমিশনারেটে কী হয়েছে? কোর্টে যাবার জন্য সেখানে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। আমি ডিজিকে ডেকেছিলাম। এটা রাজ্যে আইনের না থাকার সমান। এই সংকেত আসছে যে, এখানে ভোটে হিংসা হবে। কোনও হিংসা না হওয়া উচিত। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত।

রাজ্যপাল আরও বলেন, ‘আইনের শাসন যাতে চলে সেটা দেখা আমার দায়িত্ব। দুটো ঐতিহাসিক মন্দিরে গিয়েছিলাম। রাজ্যবাসীর জন্য সুখের প্রার্থনা করেছি।’ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁর সঙ্গে দেখা না করার প্রসঙ্গে এদিন তিনি বলেন, ‘দু-চারজন ছাড়া বাকি উপাচার্যরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। উপাচার্যদের সমস্যা আমি বুঝি। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ ক্ষমতা আছে উপাচার্য সহ গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রাখার।’