পরিযায়ী শ্রমিকদের তথ্যের খামতিতে অশনি সংকেত

324

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি :  কাজ চাই, খাদ্য চাই। কিন্তু কতজনের? জানতে প্রয়োজন পরিসংখ্যান। প্রশ্ন হল, দরকার তো বটে, দেয় কে? পরিযায়ী শ্রমিকরা আবার ভিনরাজ্যে চলে যেতে শুরু করেছেন। না গিয়ে বা করবেন কী? গ্রামের বাড়িতে থাকলে কাজ দেবে কে? প্রথম কথা, এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই নেই। দ্বিতীয় কথা, কতজন পরিযায়ী শ্রমিক গ্রামে রয়েছেন, তার কোনও তথ্যই নেই প্রশাসনের কাছে। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় অবশ্য বললেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্যের জন্য রাজ্য সরকার সবরকমের পদক্ষেপ করছে। বিনা পয়সায় চাল দেওয়া হচ্ছে। একশো দিনের প্রকল্প সহ বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। স্বনির্ভর প্রকল্পে স্বল্প সুদে ঋণও দেওয়া হচ্ছে। পঞ্চায়েতমন্ত্রী বলছেন বটে, কিন্তু অভিজ্ঞ আমলাদের বক্তব্য, পরিযায়ী শ্রমিকদের সম্পর্কে কোনও তথ্যই নেই রাজ্য সরকারের কাছে। আর পরিসংখ্যান না থাকলে তাঁদের সুযোগসুবিধা দেওয়া হবে কীসের ভিত্তিতে? পরিসংখ্যান তৈরির কোনও উদ্যোগও নেই সরকারের। না রাজ্যের, না কেন্দ্রের। লকডাউনের সময় কতজন পরিযায়ী শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, সেই তথ্যটুকু পর্যন্ত লোকসভায় দিতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। বাড়ি ফেরার পথে কত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তাও জানা নেই কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রকের।

পরিসংখ্যান তৈরির কোনও পরিকাঠামো বা উদ্যোগ যে কখনও হয়নি, তা নয়। কিন্তু সেখানেও আঠারো মাসে কাজের সরকারি সংস্কৃতি। চরম ঔদাসীন্যের জন্য তথ্য সংগ্রহের সমস্ত প্রকল্পই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। রাজ্য শ্রম দপ্তরের এমন একটি উদ্যোগ ছিল। শ্রমিকদের তথ্যপঞ্জি সংগ্রহের জন্য শ্রম দপ্তর একটি প্রোফর্মা তৈরি করেছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ওই প্রোফর্মা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহের কাজ করবে গ্রাম পঞ্চায়েত। বাস্তবে পঞ্চায়েত দপ্তরেই পড়ে রয়েছে অধিকাংশ প্রোফর্মা। ভিনরাজ্যে যাওয়া শ্রমিকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পর সেই ফর্ম পূরণ করে শ্রম দপ্তরে আর জমা পড়েনি। কোনও কোনও গ্রাম পঞ্চায়েত কিছু কিছু ফর্ম জমা দিলেও পরে আর সেই তথ্য আপডেট করা হয়নি। ফলে যাঁদের তথ্য ছিল ওই প্রোফর্মাগুলিতে, তাঁরা এখন কোথায় আছেন, কী কাজ করছেন ইত্যাদি কোনও তথ্যই সরকারের হাতে নেই। পরিযায়ী শ্রমিকদের তথ্য সংগ্রহের জন্য সেফ মাইগ্রেশন নামে আরেকটি প্রকল্প চালু হয়েছিল রাজ্যে। কয়েক বছর পর বন্ধ হয়ে যায় সেই প্রকল্পটিও। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৫ সালে মানবপাচার রোধে সক্রিয় একটি বেসরকারি সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে প্রকল্পটি প্রথম চালু করে। প্রাথমিক অবস্থায় উত্তর ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় ৬টি করে মোট ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রকল্পটিতে তথ্য সংগ্রহ করা শুরু হয়। প্রকল্পটির গুরুত্ব বুঝে ২০০৭ সালে ইউনিসেফ সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংগঠনটিকে আর্থিক সহযোগিতা করে। সেই সহযোগিতায় উদ্যোগটি সম্প্রসারিত হওয়ায় রাজ্যের অন্য অংশের সঙ্গে এই প্রকল্পে যুক্ত হয় দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন ব্লক। প্রকল্পটির সাফল্য দেখে ২০০৯ সালে রাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি অধিগ্রহণ করে। ওই বছরই ইউনিসেফের সহযোগিতায় সরকারি উদ্যোগে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, অবিভক্ত জলপাইগুড়ি, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রকল্পটি চালু হয়েছিল। সেই সময় রাজ্যের মোট ২৮১টি গ্রাম পঞ্চায়েতকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সাল পর্যন্ত চলার পর রাজ্য সরকার ওই প্রকল্পে আর কোনও অর্থ বরাদ্দ করেনি। তার পরেও কিছুদিন হাতেগোনা দুএকটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিজস্ব উদ্যোগে প্রকল্পটি চালু রাখলেও ধীরে ধীরে সর্বত্রই বন্ধ হয়ে যায়। পরিযায়ী শ্রমিকদের সম্পর্কে তথ্য জানা না থাকলে যেমন তাঁদের কাজের ব্যবস্থা বা অন্য কোনও উপায়ে সহযোগিতা করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনই সমস্যা সংকুল এই শ্রমিকরা যে দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন, তার হাতে-গরম প্রমাণ, অতি সম্প্রতি আল-কায়দা জঙ্গি সন্দেহে মুর্শিদাবাদ থেকে ৬ জনের গ্রেপ্তারের ঘটনা।

- Advertisement -

ওই ৬ জনের অধিকাংশই পরিযায়ী শ্রমিক। কেরলে কাজ করতে গিয়েছিল তারা। সেসময়ই তাদের দেশবিরোধী কাজে জঙ্গি সংগঠনগুলি মগজধোলাই করেছে বলে এনআইএ জানতে পেরেছে। পরে বাড়ি ফিরে তারা পুরোপুরি জঙ্গি তৎপরতায় নিজেদের জড়িয়ে ফেলে। এতে তাদের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছে এনআইএ। একদিকে মগজধোলাই, অন্যদিকে বিপুল টাকা হাতে পাওয়ার লোভে বিপথগামী হয়েছে এই পরিযায়ী শ্রমিকরা। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজ করেন। তাঁদের কাউকে যে কেউ মগজধোলাই করছে না, তা কে বলতে পারে? সরকারের কাছে ওঁদের সম্পর্কে পুরো তথ্য ও হালহদিস থাকলে এই বিপদ ঠেকানো যেত। সেফ মাইগ্রেশন প্রকল্পটিতে কিন্তু ভিনরাজ্যে যাওয়া শ্রমিকদের সমস্ত তথ্য রাখার সুযোগ ছিল। ওই প্রকল্পে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি করে পরিচয়পত্র দেওয়া হত। সেই পরিচয়পত্রের একদিকে ছবি সহ শ্রমিকের বিস্তারিত পরিচয় থাকত। অন্যদিকে, তিনি যে এলাকার বাসিন্দা, সেই এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত, মহকুমা ও জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের পরিবারের কারও টেলিফোন নম্বর হিন্দি এবং ইংরেজিতে লেখা থাকত। থাকত পুলিশের কন্ট্রোল রুম সহ একাধিক হেল্পলাইন নম্বর। ভিনরাজ্যে গিয়ে বিপদে পড়লে পরিচয়পত্রে উল্লিখিত নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করে যেমন যাবতীয় সহযোগিতা পেতেন শ্রমিকরা, তেমনই প্রশাসনের পক্ষে ওই শ্রমিকদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখার সুযোগ ছিল।

গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তর থেকে বিলি করা পরিচয়পত্র ওই সেফ মাইগ্রেশন প্রকল্পে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরে যে রেজিস্টার থাকত, তাতে এই খোঁজখবর রাখার বন্দোবস্ত ছিল। সংশ্লিষ্ট শ্রমিক কোন রাজ্যের কোন এলাকায় যাচ্ছেন, পরিবার সহ যাচ্ছেন না একা যাচ্ছেন, কোনও ঠিকাদার নাকি অন্য কারও মাধ্যমে যাচ্ছেন, যাঁদের সঙ্গে যাচ্ছেন, তাঁদের ফোন নম্বর সহ বিস্তারিত তথ্য এবং শ্রমিকের বাড়ি ফেরার সম্ভাব্য তারিখও এই রেজিস্টারে নথিভুক্ত থাকত। পরে এই রেজিস্টারের ধাঁচে একটি কম্পিউটার সফটওয়্যারও তৈরি করা হয়েছিল। সম্ভাব্য তারিখে শ্রমিকটি বাড়িতে ফিরেছেন কি না, ফোন করে গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তর থেকে খবর নেওয়া হত। গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরে নথিভুক্ত শ্রমিকদের রিপোর্ট প্রত্যেক তিন মাস পরপর ব্লক, মহকুমা এবং জেলা প্রশাসনের দপ্তরে পাঠানো হত। এতে যেমন প্রশাসনের কাছে শ্রমিকদের সমস্ত তথ্য জানা থাকত, শ্রমিকদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার সুযোগ ছিল। যে বেসরকারি সংগঠনটি প্রকল্পটি শুরু করেছিল, তারা আবার নিজেদের উদ্যোগে মাস সাতেক আগে একই ধাঁচে ভিন্ন নামে আলিপুরদুয়ার জেলার ঝুমরা, হান্টাপাড়া এবং বীরপাড়া-২ গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রকল্পটি চালু করেছে।

ওই সংস্থার প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর সিরাজুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, সরকারিভাবে উদ্যোগ না নেওয়া হলে কোনও বেসরকারি সংস্থার পক্ষে এই ধরনের কাজে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। প্রকল্প চালু হওয়ায় তাঁদের সুবিধা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হান্টাপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান শচীন তিরকি। তাঁর বক্তব্য, পেটের টানে বহু চা বাগানের শ্রমিক ভিনরাজ্যে যান। তাঁদের কোনও তথ্যই এতদিন আমাদের কাছে ছিল না। এখন আমরা সেই তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি। ওই তথ্য বিভিন্নভাবে আমাদের কাজে লাগবে। ইতিমধ্যে সংক্রমণের ভয়কে উপেক্ষা করে পরিযায়ী শ্রমিকরা ফের পাড়ি দিতে শুরু করেছেন কেরল, তামিলনাডু বা দিল্লির উদ্দেশে। পরিবারের মুখে দুবেলা দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের এই ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য রাজ্যে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় নেই। অথচ সরকারি স্তরে তথ্যের দৈন্য এমনই যে, করোনা ভাইরাস হানা না দিলে আমরা জানতেও পারতাম না মুম্বই বা দিল্লির বস্তিতে ঘর বেঁধে ছিল বাংলার হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার। অন্য সময় এই পরিযায়ী শ্রমিকরা ব্রাত্য থাকলেও এঁরা মহার্ঘ হয়ে ওঠেন ভোটের সময়। বিশেষ করে পঞ্চায়েত নির্বাচনে। তখন নেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন এঁদের ভোট নিশ্চিত করার জন্য। হাতে-পায়ে ধরে হলেও তখন ভিনরাজ্য থেকে গ্রামে ডেকে আনবেন তাঁদের। বামফ্রন্ট থেকে তণমূল-কোনও আমলেই এই ছবির পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু অন্যসময় তাঁদের তথ্যই জানে না সরকার।