মুখ ফিরিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল, করোনায় ভরসা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা

339

নয়াদিল্লি : ভারতের গণস্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সরকারি চিকিত্সা কাঠামোর হাল বহুদিন ধরে বেহাল। ৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির স্বপ্নে বিভোর কেন্দ্রীয় সরকার দেশের জিডিপির যৎসামান্য অংশ ব্যয় করে গণস্বাস্থ্যখাতে। এখন এই নড়বড়ে পরিকাঠামো নিয়ে নোভেল করোনা ভাইরাসের মোকাবিলায় নেমেছে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অন্যদিকে দেশের ২.৪ লক্ষ কোটি টাকার বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা করোনা মোকাবিলায় অংশগ্রহণ করা তো দূরস্থান, সাইডলাইনের বাইরে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। করোনা মহামারি রুখতে সরকারি হাসপাতালগুলির চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন বিপন্ন করে লড়াই করছেন। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম কিন্তু করোনা সংক্রমণের ভয়ে ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছে। সাধারণ রোগীদেরও চিকিৎসা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দেশের একাধিক ঝাঁ চকচকে বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে।

বিভিন্ন মহলের ক্ষোভ, দেশের হাসপাতালগুলিতে মোট শয্যার পরিমাণ যত, তার দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি হাসপাতালগুলির দখলে। করোনা রোগীদের প্রয়োজনে ভেন্টিলেটার তৈরির জন্য মারুতি সুজুকি, মাহিন্দ্রার মতো গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে অনুরোধ করতে হচ্ছে কেন্দ্রকে। অথচ দেশে যত ভেন্টিলেটার রয়েছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালগুলির হাতে রয়েছে। সেগুলির মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম এখন ব্যবহার হচ্ছে। সারাদেশে প্রতি পাঁচজন চিকিৎসকের মধ্যে ৪ জনই বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত। অথচ করোনা সংকটের সময় তাঁদের কার্যত পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ অসুখবিসুখের চিকিৎসা করার বদলে ঘরে দরজা এঁটে বসে রয়েছেন তাঁরা। বিহারের কথাই ধরা যাক। বিহারের সরকারি হাসপাতালগুলিতে মোট শয্যার সংখ্যা ২২ হাজার। অথচ সেখানে বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে শয্যা সংখ্যা ৪৭ হাজার। বিহারের স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান সচিব সঞ্জয় কুমার কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা পুরোপুরি অচল এখন। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ওই হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা পুনরায় চালুর জন্য নির্দেশ জারি করতে হয়েছে সরকারের তরফে।

- Advertisement -

দেশে সবথেকে খারাপ অবস্থা মহারাষ্ট্রে। সবথেকে বেশি মৃত্যুও হয়েছে এই রাজ্যে। তারপরেও মুম্বইয়ে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কোথাও আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে কোভিড আক্রান্তদের। বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে করোনা চিকিৎসায় কোনও বাধা নেই। অথচ একজন করোনা রোগীকে ভর্তি করলে যদি হাসপাতালে সবাই সংক্রামিত হয়ে পড়েন এবং বৃহন্মুম্বই পুরসভা যদি হাসপাতাল সিল করে দেয়, সেই ভয়ে করোনা রোগীদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার একাধিক নজির মিলেছে বাণিজ্যনগরীতে। করোনা সহ বহু দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি হাসপাতালগুলির এভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে চর্চা শুরু হয়েছে। পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার সভাপতি কে শ্রীনাথ রেড্ডি বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলি তো করোনা মোকাবিলায় সাহায্য করতে চায়। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এই সাহায্য লাগবে এবং কতটা লাগবে, সেটা আগে নির্ণয় করা দরকার। অ্যাপোলো হাসপাতাল গোষ্ঠীর জয়েন্ট ম্যানেজিং ডিরেক্টর সংগীতা রেড্ডি বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্র তো চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের ভয় রয়েছে। কিছু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাদের মধ্যে নার্সিংহোমও কিছু রয়েছে। তারা চিন্তিত বলেই এমনটা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ম্যাক্স হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান তথা রেডিয়ান্ট লাইফকেয়ারের সিএমডি অভয় সোই বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে অনেকে অসম্মানিত করার চেষ্টা করছেন। অথচ আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে বহু হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। আয়ুষ্মান ভারত তথা ন্যাশনাল হেলথ অথরিটির সিইও ইন্দু ভষণ জানিয়েছেন, মধ্যপ্রদেশ, বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে যেখানে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বেসরকারি ক্ষেত্রের হস্তক্ষেপ খুব দরকার।