ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই : শিক্ষিত বেকারদের হতাশা রাজ্যজুড়ে

2855

শুভঙ্কর চক্রবর্তী : চাকরি? ওরে চাকরি কোথায় পাবি, চাকরি কোথায় আছে?

রবীন্দ্রনাথের কবিতার পংক্তি অদলবদল করে নিলেই পশ্চিমবঙ্গে বেকারদের ভাষ্য পাওয়া যাবে। চাকরিই নেই। কবে শেষ বড় রকমের নিয়োগ হয়েছিল রাজ্যে, কেউ মনেই করতে পারেন না। বামফ্রন্ট জমানায় তবু যাই হোক, প্রায় বছর বছর শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা হত। হাজার হাজার নিয়োগও হত। প্রাথমিক স্কুলে তো বটেই, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকেও। স্কুল সার্ভিস কমিশন তো তখন অন্যতম চাকরির বাজার ছিল। নিয়োগ নিয়ে স্বজনপোষণ, আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ যে ছিল না, তা নয়। কিন্তু পরীক্ষা দিয়ে মেধার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন অনেকেই। এমন নয় যে, বামফ্রন্ট আমলে কর্মসংস্থানের ঢালাও বন্দোবস্ত ছিল। কিন্তু ওই সামান্য সুযোগটুকুও আর নেই এখন। বছর বছর শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু রাজ্যে কর্মসংস্থানের সমস্ত দরজাই প্রায় বন্ধ।

- Advertisement -

যে যতই লেখাপড়া করুন, যতই ডিগ্রি থাকুক সরকারি চাকরি অনিশ্চিত। রাজ্যে তেমনভাবে শিল্প না গড়ে ওঠায় বেসরকারি ক্ষেত্রেও শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ নেই। তৃণমূল রাজত্বে নিয়োগের কিছু ঘোষণা করা হয়েছে, কখনো-কখনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, এমনকি ইন্টারভিউ নেওয়াও হয়েছে। ওই পর্যন্তই। নিয়োগ আর হয়নি। কেউ প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরির জন্য টেট পাশ করে বসে আছেন, কেউ গ্রুপ-ডির ইন্টারভিউ দিয়ে অপেক্ষা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে আবার আবেদন করার পর কয়েক বছর কেটে গেলেও পরীক্ষা হয়নি। শুধু রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নয়, নিয়োগ আটকে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতেও। দিন যত গড়াচ্ছে, তাই অসন্তোষ ততই তীব্র হচ্ছে রাজ্যের কর্মপ্রার্থীদের মধ্যে। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য নিয়োগ না হওয়ার জন্য আইনি জটিলতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের আমলে প্রচুর নিয়োগ হয়েছে। মামলার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন নিয়োগে সমস্যা হচ্ছে। আইনি জটিলতা এড়িয়ে আমরা যতটা সম্ভব নিয়োগের চেষ্টা করছি।

বাস্তব ছবিটা কী? দি সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)-র তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৪ তারিখ অর্থাৎ শুক্রবার রাজ্যে বেকারত্বের হার ১৪.৯ শতাংশ। দেশের ক্ষেত্রে ওই হার ৮.৩ শতাংশ। ইতিপূর্বে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে দাবি ছিল, বেকারত্বে জাতীয় গড়ের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাটা ভালো। গত মে মাসে রাজ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৭.৪১ শতাংশ, দেশের ক্ষেত্রে ২৩.৪৮ শতাংশ। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র সেই তথ্য সগর্বে টুইটে জানিয়েছিলেন। সরকার যাই দাবি করুক, বেকাররা দেখতে পাচ্ছেন, চাকরি কোথাও নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চায়ে দোকান দিতে হচ্ছে। কেউ স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়ার পর সাফাইকর্মীর চাকরি নিচ্ছেন। আবার একটি বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাই প্রশ্ন উঠছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তৃণমূল সরকার করলটা কী? বিজেপি এই প্রশ্নেই ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে নবীন প্রজন্মের অসন্তোষ আরও উসকে দিয়ে কিস্তিমাত করতে মরিয়া। বিজেপির এই কৌশল মোকাবিলায় তৃণমূলের হাতে তেমন কোনও অস্ত্র দেখা যাচ্ছে না।

এর প্রমাণ নিয়োগ সম্পর্কিত কিছু তথ্য। যেমন, ২০১৬ সালে সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী গ্রুপ-ডি পদে রাজ্যে ধাপে ধাপে ৬০ হাজার কর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার তৃণমূল ক্ষমতায় ফেরার পর ৬ হাজার কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ওয়েস্ট বেঙ্গল গ্রুপ-ডি রিক্রুটমেন্ট বোর্ড। ২০১৭ সালের ২০ মে লিখিত পরীক্ষাও হয়। আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লক্ষ। চতুর্থ শ্রেণির পদের জন্য এই পরিমাণ আবেদনে বোঝাই যায়, রাজ্যে কর্মসংস্থানের ছবিটা কেমন। ২০১৮ সালের ১৮ অগাস্ট ওই পরীক্ষার চূড়ান্ত মেধাতালিকা প্রকাশিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় ১৯ লক্ষের মধ্যে সফল ১৮ হাজার চাকরিপ্রার্থীকে ইন্টারভিউয়ে জন্য ডাকা হয়েছিল। পরে ৫৪২২ জনকে নিয়োগ করে রাজ্য। ওয়েটিং লিস্টে ছিল ১০০০ জনের নাম। তখনকার বিজ্ঞপ্তি অনুসারে শূন্যপদ ছিল আরও ৫৭৮টি। সেই শূন্যপদে নিয়োগ হয়েছে কি না বা হলে কাদের হয়েছে, সেই তথ্য এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি।

অভিযোগ, নিয়ম ভেঙে কিছু শূন্যপদে নিয়োগ হয়েছে। তথ্য জানার অধিকার আইনে বিষয়টি জানার জন্য একাধিক আবেদন জমা পড়লেও নিয়োগ বোর্ড কোনও উত্তর দেয়নি বলে অভিযোগ। ওয়েটিং লিস্টে থাকা চাকরিপ্রার্থীরা একত্রিত হয়ে এখন আন্দোলন শুরু করেছেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষে আশিস খামরাই বলেন, মেধার ভিত্তিতে পরীক্ষায় পাশ করেছি। অথচ ন্যায়বিচার পাচ্ছি না। রাজ্য সরকার আমাদের দাবির কথা শুনছেও না। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের লাঠি খেতে হয়েছে। আমরা চাই, দ্রুত আমাদের নিয়োগ করুক রাজ্য। জেলা শাসকদের কাছে স্মারকলিপি প্রদান ছাড়াও কলকাতায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এই কর্মপ্রার্থীরা। অন্যদিকে, আইনি জটিলতায় কয়ে বছর ধরে আটকে রয়েছে উচ্চপ্রাথমিকে শিক্ষক পদে নিয়োগ। ২০১৫ সালের পরে ডিএলএড কোর্স করেছেন, প্রাথমিকে প্রশিক্ষণহীন টেট উত্তীর্ণ এমন প্রায় ১০০০ চাকরিপ্রার্থীর নিয়োগ নিয়ে জটিলতা চলছে। আবার বাইরের রাজ্যে নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে এসে মাইগ্রেশন সমস্যার জেরে বাংলায় রেজিস্ট্রেশন পাচ্ছেন না অনেকে। ফলে নার্সের চাকরিও তাঁদের কাছে অধরা। এদিকে, রাজ্যে যথেষ্ট সংখ্যক নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারের অভাব। বাধ্য হয়ে অনেকে ভিনরাজ্যে ট্রেনিং নিতে যান। কিন্তু ফিরে আর চাকরি পান না। উত্তর দিনাজপুর জেলায় পঞ্চায়েতের বিভিন্ন স্তরে নিয়োগের জন্য ২০১৬ সালে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েিল। নানা কারণে সেই বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ফের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। পরীক্ষাও হয়। তবে এখনও পর্যন্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। উত্তর দিনাজপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি কবিতা বর্মন বলেন, বিষয়টি পঞ্চায়েত দপ্তর দেখছে। দপ্তরের মন্ত্রীর গোচরে আনা হয়েছে। বছর দশেক আগে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কয়েকশো শিক্ষাকর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। প্রায় ১৫ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে। সেই নিয়োগের পরীক্ষাও হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার দিলীপকুমার সরকার বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া ফের শুরু হয়েছে। পুরোনো আবেদনকারীরাও সুযোগ পাচ্ছেন।