ঘরের ছেলে বাইরে গিয়ে পরিযায়ী শ্রমিক

564
রহিত বসু

সারা দেশে যখন ভাতের লড়াই নিয়ে কথা হচ্ছে, তখন তার মধ্যে অনেকে মেরুকরণ ও জাতের লড়াইয়ের কথা টেনে আনছেন। এর ফলে, হুগলি জেলার একাংশে গোলমাল হয়েছে। তার জেরে গঙ্গার দুপাড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে হয়েছে। আমি দেখছি, আমাদের ফেসবুক পেজেও কেউ কেউ এমন মন্তব্য পোস্ট করছেন, যা সুস্থ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না। যাঁরা এসব লিখছেন, তাঁরা একটা জিনিস তো বুঝবেন! মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে মানেই আপনি এমন কোনও কাজ বা মন্তব্য করতে পারেন না যাতে মানুষে মানুষে সম্পর্ক বিপন্ন হয়। আমরা মানুষের অধিকারের কথা বলি, তার অর্থ এই নয় যে, আমরা দুর্নীতি, জাতপাত, ধর্মীয়  মেরুকরণে উসকানি দেওযার চেষ্টা সমর্থন করি। কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও নীতি বা কাজে যদি মানুষের স্বার্থ বা অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে আমরা তার বিরুদ্ধে সরব হই। কিন্তু আমরা দেশের আইন মেনে চলি। অতএব, আমাদের ফেসবুক পেজে যাঁরা ভুলভাল লিখছেন তাঁদের আমি বলব, মেরুকরণে উসকানি দেওয়ার জন্য আপনার যদি কিছু লেখার থাকে, তাহলে পাড়ার দেওয়ালে গিয়ে লিখুন। এখন তো রাস্তাঘাট ফাঁকাই আছে। তারপর পুলিশ আপনার সঙ্গে বুঝে নেবে। শুধু শুধু আমাদের দেওয়াল নোংরা করে লাভ কী?

আমি বরং বলব, চারপাশে এমন অনেক রহস্যজনক ঘটনা ঘটে চলেছে, যা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। য়েমন, করোনা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। এই ভাইরাস কোথা থেকে এল, একে মোকাবিলার পথ কী, ফুসফুসের ভিতরে এর কাণ্ডকারখানার ধরন কেমন, এমন আরও অনেক কিছু। নেতা বলুন অথবা ডাক্তার, সকলেই বলছেন, করোনাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। তাই শুনে হিন্দু পত্রিকায় কর্মরত আমার সাংবাদিক বন্ধুর পরিচিত চিকিৎসক জানতে চেয়েছেন, তাহলে এতদিন লকডাউনের অর্থ কী? আবার চিত্র পরিচালক সুব্রত সেনের কথাই ধরুন। প্রেসিডেন্সি কলেজের এই ছাত্র দীর্ঘদিন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন। তাঁর প্রশ্নেও সংখ্যা নিয়ে রহস্য রয়েছে। তিনি বলছেন, এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ড ফান্ডে যে টাকা কাটে সেটা আমার টাকা। সেই টাকার ২.৫ শতাংশ কম কেটে বলল, এই দ্যাখো এই টাকা কাটলাম না, সুতরাং এতে আমার ২০ লক্ষ কোটির ৪৫০০০ কোটি তোমায় দিলাম! আমার টাকা আমাকেই দিয়ে বলল, এটা সরকার দিল। কী অঙ্ক, কোথাকার অঙ্ক কে জানে! আবার অনেকে জানতে চাইছেন, ১০০ কোটির লেনদেন হলেই যদি মালিকদের ঋণ দেওযা হয়, তাতে শ্রমিকের কী লাভ? বাজারে যদি চাহিদা না থাকে তাহলে ঋণ দিয়ে কী হবে? আর বাজারে চাহিদা কী করে বাড়ে তা বুঝতে অর্থনীতি পড়ার দরকার নেই। গরিব, মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক-কৃষকের হাতে টাকা এলে চাহিদা এমনিই বাড়ে। তার থেকেও বড় প্রশ্ন, বছরে ১০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, এমন কটা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী খুঁজে পেলেন? এর মধ্যেই জানিয়ে রাখা ভালো, বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী দেশ আমেরিকায় গত সপ্তাহে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমেরিকায় আরও অনেক কিছু হচ্ছে। সেসব নিয়ে না হয় পরে আলোচনা করা যাবে। আপাতত ঘরের দিকে নজর দেওয়া যাক।

- Advertisement -

যেমন ধরুন, প্রতি বছর শুনি ১০০ দিনের কাজে বাংলা এগিয়ে রয়েছে। এরপর স্লোগান হয়ে গেল, এগিয়ে বাংলা। আগের ৩৪ বছরেও একই কথা শুনেছি। চৌত্রিশের সঙ্গে নয় জুড়লে হয় তেতাল্লিশ। অর্থাৎ, নেতাদের কথায় বিশ্বাস করলে ৪৩ বছরে এই বাংলায় স্বর্গ নেমে আসার কথা। কিন্তু আমি ভাবছি, স্বর্গই যদি নামবে তাহলে এত মানুষ স্বর্গ ছেড়ে কাজের খোঁজে বাইরে গিয়েছিলেন কেন? কাজের খোঁজে বাইরে গিয়ে ঘরের ছেলের নাম হয়ে গেল পরিযায়ী শ্রমিক। এখন তাঁদের ভাত-কাপড়ের জোগাড় করতে সরকারের ভরসায় থাকতে হচ্ছে। আর প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আত্মনির্ভর হও। কী জ্বালা বলুন তো! আবার দেখুন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আমরা কত এগিয়ে রয়েছি তা নিয়ে ৪৩ বছর ধরে নেতাদের ভাষণ শুনে চলেছি। তাহলে, কোটা থেকে যেসব পড়ুয়াকে ফেরাতে হল তাঁরা কারা? আমাদেরই রাজ্যের সন্তান তো? দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসা করাতে গিয়ে যাঁরা আটকে পড়েছেন, তাঁরাও পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক তো? তাহলে এত ভাষণ দিয়ে লাভ কী? সংখ্যা লুকিয়ে বাস্তব লুকিয়ে দুর্বলতা লুকিয়ে আদতে কোনও লাভ হয় না। বাস্তব হল, শুধু গ্রাম বাংলা নয়, কলকাতার মতো মহানগর এবং শহরতলিতেও কমিউনিটি কিচেন চালাতে হচ্ছে। নেতারা যত তাড়াতাড়ি এইসব জিনিস মাথায় ঢুকিয়ে নেবেন, ততই মঙ্গল।