দিব্যেন্দু সিনহা, জলপাইগুড়ি : পদ কর্মবন্ধুর। অর্থাৎ সাফাইকর্মীর। এদিকে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাঁরা হাসপাতালের ওষুধের কাউন্টারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। সাফাইকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কাজ করছেন হাসপাতালের রেকর্ড সেকশনে। কেউ আবার ওয়ার্ড মাস্টার রুমে কাজ করছেন। কাউকে সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট (এসএনসিইউ)-এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনি কি এতে অবাক হচ্ছেন? তবে এতে খুব একটা হেলদোল নেই জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। উলটে হাসপাতাল সুপার গয়ারাম নস্কর জানিয়েছেন, গ্রুপ ডি পদে কর্মীসংখ্যা কম। তাই কর্মবন্ধুদের মধ্যে যাঁরা একটু শিক্ষিত, তাঁদের দিয়ে ওই কাজ করানো হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে আমল না দিলেও প্রশ্ন উঠেছে, কর্মবন্ধু অর্থাত্ সাফাইকর্মী পদে নেওয়ার পরেও তাঁদের দিয়ে সেই কাজ না করিয়ে কীভাবে অন্য কাজ করানো হচ্ছে? তাহলে তো সরকারের অন্যান্য দপ্তরে গ্রুপ ডি কর্মীকে দিয়ে গ্রুপ সি পদের কাজ করানো যেত। অথবা কোনো স্কুলে করণিককে ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হত। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্মীসংখ্যা কমের অজুহাত দিয়ে যে কাজ চালাচ্ছে তাকে বেআইনি বলেই মনে করছে বিভিন্ন সংগঠন। কর্মবন্ধুদের কাজ কী হবে, সরকারি নির্দেশে তা স্পষ্ট করে বলা আছে। অথচ জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে কর্মরত কর্মবন্ধুদের অনেককেই অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেখা গিয়েছে, জেলা তৃণমূলের এক নেতার ভাইকে দিয়ে হাসপাতালের ওষুধের কাউন্টারে কাজ করানো হচ্ছে। আবার হাসপাতালের রেকর্ড রুমে কাজে লাগানো হয়েছে এক তৃণমূল কর্মীকে। এমনকি ওয়ার্ড মাস্টার রুমেও তাঁদের কাজ করানো হচ্ছে।

হাসপাতালের রোগীদের পরিসেবার স্বার্থে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর স্টেট হেলথ সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট-২ (এসএইচএসডিপি)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ক্যাভেঞ্জিং পদে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা শুরু করে। সম্প্রতি এই পদের নাম পরিবর্তন করে কর্মবন্ধু করা হয়। কর্মবন্ধুদের কাজ হল, হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। চিকিৎসাধীন রোগীদের পরিষ্কার রাখার কাজও করেন তাঁরা। এছাড়া কোনো রোগীর মল এবং মূত্র পরীক্ষার প্রয়োজন হলে, সেগুলি ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে দেওয়াও তাঁদের কাজ। প্রথম অবস্থায় জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে এই পদে কম কর্মী নেওয়া হলেও ২০১১ সালের পর থেকে এই সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়। বর্তমানে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে কর্মবন্ধু পদে মোট ৮৫ জন কাজ করছেন।

এইভাবে অন্য কাজে লাগানো নিয়ে কর্মবন্ধুদের অনেকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও, চাকরি হারানোর ভয়ে তাঁরা মুখ খুলতে চাননি। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। সংস্থার কর্ণধার সুব্রত ঘোষ জানিয়েছেন, তাঁর কাজ কর্মী সাপ্লাই দেওয়া। তিনি সেই কাজটুকুই করে থাকেন। কর্মীদের কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা দেখার দায়িত্ব তাঁর নয়।  এদিকে ঘটনা নিয়ে মুখ খুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। জেলা যুব কংগ্রেসের সভাপতি ভোলা রাউত বলেন, জেলা হাসপাতালে অনেক অনিয়মের খবর আমাদের কাছে আসছে। এখন এই খবরও পাচ্ছি। হাসপাতালে কর্মীসংখ্যা কম বলে  সাফাইকর্মীদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করানো হবে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি জানান, আগামী ৩ তারিখ সংগঠনের তরফে হাসপাতাল অভিযান এবং স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। ওইদিন বিষয়টি জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে জানতে চাওয়া হবে বলে তিনি জানান। বামফ্রন্টের জেলা আহ্বায়ক সলিল আচার্য বলেন, হাসপাতালে অনেক বেআইনি কাজ হচ্ছে। আমাদের তরফে পদক্ষেপ করা হবে। বিজেপির জেলা সভাপতি দেবাশিস চক্রবর্তী বলেন, কিছু তৃণমূল নেতা নিজেদের স্বার্থে পরিবারের লোকেদের হাসপাতালে নিয়ে কাজ দিচ্ছেন। এ নিয়ে বিজেপির স্বাস্থ্য পরিসেবা সেল পদক্ষেপ করছে। তণমূলের জেলা সভাপতি কিষান কল্যাণী জানান, তিনি বাইরে আছেন। ফিরে এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।