বলরাম হাজরার গুরুকুল এখন মুদির দোকান

অভিজিৎ ঘোষ, সোনাপুর : তিনি কিংবদন্তি। তাঁর ঢাকের বোলে মেতে উঠত আট থেকে আশি। একসময় তাঁর হাত ধরে আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের তপসিখাতা গ্রাম পঞ্চায়েতে অন্তর্গত দক্ষিণ পাটকাপাড়ার হাজরাপাড়া গ্রামের নাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজ্য সরকার তাঁকে বঙ্গরত্ন সম্মান দেয়। তাঁকে অনুসরণ করে এই গ্রামের শতাধিক মানুষ ঢাক বাজানোকে পেশা করে নিয়েছেন। প্রবাদপ্রতিম বলরাম হাজরা এই ঢাকিদের প্রশিক্ষণ দিতে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর গুরুকুল। তাঁর প্রয়াণের পরই গুরুকুলের দরজা বন্ধ হয়েছে। অনটনে সেই ঘরে এখন মুদির দোকান দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী।

উত্তরবঙ্গ তো বটেই, গোটা রাজ্য ঢাকের বোলে মাতিয়ে দিয়েছেন বলরাম হাজরা। ভিনরাজ্য থেকেও ডাক পড়ত তাঁর। জীবিত থাকাকালীন তাঁর হাতের জাদুবিদ্যা উত্তরসূরিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি নিজের গ্রামেই তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিদ্যালয়। নাম দিয়েছিলেন গুরুকুল। সেসব ইতিহাস। তাঁর অবর্তমানে সংসারে এখন অভাব আর দুঃখের বাসা। বলরাম হাজরার স্বপ্নের গুরুকুল এখন হয়ে উঠেছে তাঁর স্ত্রীর মুদির দোকান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস।

- Advertisement -

দক্ষিণ পাটকাপাড়ার হাজরাপাড়া গ্রামের প্রায় ১৫০ জন ঢোলবাদক উত্তরবঙ্গ সহ বিভিন্ন জায়গায় ঢোল বাজিয়ে থাকেন। প্রয়াত বলরাম হাজরার হাত ধরে এই গ্রামের বাসিন্দাদের এই পেশায় পা বাড়ানো। বলরামবাবুর তাঁর ছাত্রদের নানান বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী করার জন্য এবং এলাকার ঢোলবাদকদের তালিম দেওয়ার লক্ষ্যে তাঁর বাড়ির সামনেই গুরুকুলের প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেই দিনভর তাঁর মহড়া চলত। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকজনকে বলরামবাবু আতিথেয়তা করতেন গুরুকুলে বসেই। তাঁর শিষ্যদের কাছে এটাই ছিল দ্বিতীয় বাড়ি।

২০১৮ সালে ছবিটা বদলে যেতে শুরু করে। এপ্রিল মাসে মারা যান এই প্রবাদপ্রতিম লোকশিল্পী। তাঁর শিষ্যরা গুরুর দেওয়া শিক্ষাকেই নিজেদের নেশা ও পেশা হিসাবে নিয়ে ঢোল বাজিয়ে চলছেন। কিন্তু গুরুকুলকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেননি তাঁরা। স্বামীর জীবদ্দশায় ভারতী হাজরাকে অভাব ছুঁতে পারেনি। বলরামবাবু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর প্রতিভা দেখিয়ে যা উপার্জন করতেন, তাতে তাঁদের তিনজনের সংসার খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটত। তবে এখন ভারতীদেবীকে অভাব আর দুশ্চিন্তা তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বাড়িতে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি।

ভারতীদেবীর কাছে সম্বল বলতে শুধু স্বামীর পাওয়া সম্মানটাই আছে। কঠিন বাস্তবে শুধু সম্মান দিয়ে যে পেটের ভাত জোগাড় হয় না, সেটা বুঝে গিয়েছেন তিনি। বলরামবাবুর মৃত্যুর পর তার পৈতৃক কিছু জমিতে চাষাবাদই ছিল ভারতী হাজরার প্রাথমিকভাবে উপার্জনের উৎস। তবে সেই উপার্জনের অর্থে সংসার চালানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তাঁর দুঃসময়ে বন্ধন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসে। প্রায় আট মাস আগে তাঁকে মুদিখানা খুলতে সহযোগিতা করে তারা। অনেক কষ্ট লুকিয়ে স্বামীর তৈরি গুরকুলে ভারতী হাজরার মুদিখানা শুরু হয়।

ভারতীদেবী বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক জনপ্রতিনিধির কাছে বিভিন্ন রকম আশ্বাস পেলেও কোনওরকম সুবিধাই পাইনি। অনেক জায়গায় দরবার করার পর কিছুদিন আগে ছেলের জন্য মানবিক ভাতা পাওয়া শুরু হয়েছে। স্বামী জীবিত থাকাকালীন প্রশাসনিক অনেক রকম সাহায্যই পেয়েছিলাম। তবে বর্তমানে তেমন কোনও সহযোগিতা পাই না। যদি আমার জন্য ভাতার ব্যবস্থাটুকু প্রশাসন থেকে করে দিত তবে উপকৃত হতাম। বলরামবাবুর ভাইপো ও শিষ্য মনতোষ হাজরা বলেন, কাকিমার এতটাই অভাব যে, ঘরের চাল ফুটো হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টি হলেই জলে ঘর ভরে যায়। সেটা সারানোর সামর্থ্য নেই। গুরুর মৃত্যুর পর গুরুকুলও ধীরে ধীরে বন্ধ হয় যায়। আমরা এটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। তবে সবারই নিজস্ব কাজ থাকায় সেটা আর সম্ভব হয়নি।