সর্বস্বান্ত কৃষককে বাঁচাচ্ছে হাতি বাজার

114

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : নাম হাতি বাজার। এই বাজারে অবশ্য আস্ত হাতি বিক্রি হয় না। হাতির হানায় নষ্ট হওয়া ফসলের যেটুকু বেঁচেবর্তে থাকে, তা এই বাজারে মেলে। সশরীরে এই বাজারের এখনও কোনও অস্তিত্ব নেই। আছে ফেসবুকের মতো বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সংশ্লিষ্ট পেজে কৃষকের ফোন নম্বর ও তাঁর কাছ থেকে কোন কোন ফসল মিলতে পারে সেই বিবরণ থাকছে। নির্দিষ্ট নম্বরে যোগাযোগ করলে ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য কেনার প্রস্তাব আসছে। তেমন হলে সেই ফসল হোম ডেলিভারির ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। সবার সঙ্গে যোগাযোগের এক মাধ্যমকে স্রেফ আড্ডা মারার জায়গা না বানিয়ে কীভাবে কাজের কাজ করা যায় তা এই বাজারে করে দেখাচ্ছে।

বন দপ্তরের বাগডোগরার রেঞ্জ অফিস সূত্রে খবর, এই রেঞ্জের আওতায় হাতি উপদ্রুত ৩০টিরও বেশি গ্রাম রয়েছে। জঙ্গলে ঘেরা মিনগারা, বাংলাবস্তি, লোহাসিংজোত, দোমোহনির মতো গ্রামের মানুষ রোজই হাতির হানার মুখে পড়েন। এই গ্রামগুলিতে প্রতিবছর হাতির হানায় বিঘার পর বিঘা জমির বহু টাকার ফসল নষ্ট হয়। নিঃস্ব হয়ে যাওয়া কৃষকের রোষের মুখে পড়ে কখনও কখনও বিপন্ন হয় হাতির জীবনও। যুযুধান দুই পক্ষের মাঝে পড়ে প্রচুর ফসল নষ্ট হলেও কিছু ফসল বেঁচেও যায়। বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হওয়ার পর এই ফসল নিয়ে কৃষকের ভাবনাচিন্তা করার মতো অবকাশ থাকে না। অথচ এই ফসল বাজারজাত করলে সংশ্লিষ্ট কৃষক কিছুটা লাভ পেতে পারেন। বাগডোগরার রেঞ্জ অফিসার সমীরণ রাজ বহুদিন আগেই এই ভাবনা ভেবেছিলেন বলে জানান। হাতির হানায় নষ্ট হওয়া টমেটো খেত থেকে সমীরণবাবু একবার কিছুটা টমেটো নিজের জন্য উদ্ধার করেছিলেন। এই সূত্রেই মস্তিষ্কে অন্য কিছু করার ভাবনার উদয়। অন্যদিকে, বেশ কয়েকক বছর ধরে সেভ এলিফ্যান্ট ফাউন্ডেশনের নর্থ-ইস্ট সার্কেলের সদস্যরা এই গ্রামগুলিতে হাতির সুরক্ষায় কাজ করছেন। এ বিষয়ে তাঁরাও সমীরণবাবুকে প্রস্তাব দিলে গোটা বিষয়টিকে একটি সর্বসম্মত রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

- Advertisement -

এ বিষয়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ অফিসেরই এক বনকর্মীর কৃষক পরিবার এগিয়ে আসে। পরিবারটি প্রতি বছরই হাতির হানার মুখে পড়ে। হাতি বাজার নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতেই  বিক্রির জন্য দেওয়া কালো নুনিয়া, হলুদের কেনার ফোন আসে। সাফল্য দল ভারী করে। করেওছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৫০০ কৃষক  হাতি বাজার-এ যুক্ত। সমীরণবাবু হাতিপ্রেমী সংস্থাটির সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ক্ষতির মুখে পড়া কৃষকদের নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। কেষ্টপুরের কৃষক অশোক মহন্তর সঙ্গে শুক্রবার যখন যোগাযোগ করা হল তখন তিনি তাঁর ফসল প্যাকিংয়ে ব্যস্ত। তাঁর প্রতিক্রিয়া, হাতির হানায় ফসল নষ্ট হলে আগে কেউ কিছু কিনতেন না। হাতি বাজার আমাদের অন্য দিশা দেখাচ্ছে।

রেঞ্জ অফিসার সমীরণবাবু বলছেন, কোথাও হাতি বেরিয়েছে শুনলে মানুষ ভোর ৪টাতেও সেখানে ভিড় করে। হাতির হানার মুখে পড়ে বেঁচে যাওয়া ফসল কিনতে আমরা এই মানুষজনের পাশাপাশি সবাইকেই অনুরোধ করছি। তাহলে কৃষকরা বাঁচবেন। সেভ এলিফ্যান্ট ফাউন্ডেশনের নর্থ-ইস্ট সার্কেলের  প্রোজেক্ট ইনচার্জ ঋকজ্যোতি সিংহরায় বলেন, আমরা চাই তিক্ততা ভুলে মানুষ, হাতি একসঙ্গে বাঁচুক। সমীরণবাবুদের পরিকল্পনায় এবারের হাতি বাজারের একটি কাউন্টারের স্বপ্ন। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই বাগডোগরায় রেঞ্জ অফিসের কাছেই একটি কাউন্টারের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। কেষ্টপুরেও একটি কাউন্টার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ফ্লোরিকালচার অ্যান্ড অ্যাগ্রো বিজনেস ম্যানেজমেন্ট (কোফাম)-এর অধিকর্তা অমরেন্দ্র পান্ডে বলেন, শহরের একশ্রেণির ব্যবসায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ফল, সবজি কিনে অনলাইনে ব্যবসা করছেন। এই প্রবণতা এবারে কৃষকদের কাছেও পৌঁছাল। কৃষিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই ভবিষ্যত্।  হাতির উপদ্রবের জেরে অনেকে কৃষিকাজ ছাড়ছেন। এই পরিকল্পনা ভালোভাবে কার্যকর হলে কৃষিকাজে প্রান্তিক মানুষের উৎসাহ বজায় থাকবে।