পেট ভরতে সেলাই করেন গম্ভীরাশিল্পী হাফিজ

কল্লোল মজুমদার, মালদা : গম্ভীরাশিল্পী হাফিজ শেখ। সেই কৈশোর থেকেই মালদা জেলার প্রবাদপ্রতিম গম্ভীরা শিল্পী নির্মল দাস ওরফে নীরুদার হাত ধরে লোকসংস্কৃতি জগতে করেন। একটা সময় ছিল যখন দেবাদিদেব মহাদেবের সঙ্গী নন্দির ভূমিকায় অভিনয় করতেন হাফিজ শেখ। কিন্তু আজ আন্তর্জালের থাবায় যেমন হারাতে বসেছে মালদা জেলার ঐতিহ্যবাহী গম্ভিরা, তেমনই বয়সের ভারে নুব্জ প্রবীন শিল্পী হাফিজ শেখ। একটা সময় ছিল যখন হাফিজ শেখের অভিনয় দেখে সামিয়ানার তলায় হাসির জোয়ার আসত। কিন্তু এখন দুমুঠো ভাতের জন্য এখন বাড়িতে কাঁপা হাতে সেলাই করেন। দিনে চল্লিশ, পঞ্চাশ টাকা আয় হয়। যা দিয়ে ভরাতে হয় ভরা সংসারের পেট। কেউ মনে রাখেননি হাফিজ শেখকে। তাই বার বার আবেদন করেও মেলেনি লোকশিল্পীর ভাতা। তবে তা বলে আক্ষেপ নেই। হাফিজ শেখের কথায়, বয়স আশি হলেও এখনও একটাও ওষুধ খেতে হয় না, শরীরে ফোঁটেনি সুঁচ।

মালদা শহরের মিরচকের কালাপাথ্থর মসজিদ সংলগ্ন বাড়ি হাফিজ শেখের। এদিন সকালে তাঁর বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, খটর, খটর শব্দ তুলে সেলাই করে চলেছেন তিনি। ডাকতেই মেশিন থামিয়ে বাইরে চলে আসেন। এক চিলতে ঘরে বসে পুরোনো সেই দিনের কথা বলতে থাকেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চোখ ঝাঁপসা হয়ে যায়…। তিনি বলতে থাকেন, সেই কবেকার কথা। মনে নেই সবটা। তখনও তরুণ। আগে থেকেই আলাপ ছিল নীরুদার সঙ্গে। দুটো পয়সা রোজগারের জন্য নয়, ভালবাসা থেকেই নীরুদার হাত ধরে যোগ দিয়েছিলাম গোপীনাথ শেঠের গম্ভীরা দলে। তখন সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ব্রিটিশরা দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু পালায় ব্রিটিশদের নিয়ে টিপ্পনি শেষ হয়নি। শিবের সঙ্গী হয়ে নন্দী সাজতাম আমি। পরে নেতাদের চ্যালা। আমাদের কথায় হাসির রোল উঠত পাড়ার মোড়ে মোড়ে। কিন্তু এখন ওসব কেউ মনে রাখেনি। এযুগের ছেলেরা গম্ভীরার রস থেকে বঞ্চিত। মোবাইল, ইন্টারনেট সব শেষ করে দিল। গম্ভীরাকে বাঁচানো খুব জরুরী।

- Advertisement -

বাড়িতে ছেলে, ছেলের বউ, নাতি, নাতনি নিয়ে ছয়জনের সংসার। পুত্রবধূ ক্যান্সারে আক্রান্ত। কেউ একজন উদ্যোগী হয়ে বার্ধক্যভাতার কার্ড করে দিয়েছিলেন। মাসে এক হাজার টাকা ভাতা পেতেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই কার্ড হারিয়ে যাওয়ায়, টাকা পাওয়া বন্ধ হয়েছে। একাধিক বার আবেদন করেও মেলেনি লোকশিল্পী ভাতা। তাই ফের ফিরে এসেছেন দর্জির পেশায়। নতুন জামাকাপড় তৈরী নয়, পাঁচ, দশ টাকার বিনিময়ে ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক সেলাই করেন। আয়, দিনে বড়োজোড় পঞ্চাশ টাকা।