টুকরো কাঠে জীবন গড়ছেন হালিমারা

68

অভিজিৎ ঘোষ, পাতলাখাওয়া : আমাদের এখানে একটা কথা খুব শোনা যায়, বুদ্ধি থাকলে কেউ ঘরজামাই থাকে না। এই প্রবাদ বাক্যটাই হয়তো একটু বাঁকা চোখে নিয়েছিলেন ছাট সিঙ্গিমারির হালিমা বিবি। তিনি এখন প্রমাণ করে দিয়েছেন, বুদ্ধি থাকলে কেউ গৃহবধূ হয়ে আজীবন কাটিয়ে দেয় না। তবে নিজে একা নন, এই নবজাগরণে শামিল করেছেন গ্রামের বাকি মহিলাদেরও। তাঁদের মিলিত প্রয়াসেই দ্রুত বদলাচ্ছে গোটা গ্রামের অর্থনীতি, বদলাচ্ছে চিন্তাভাবনাও।

কোচবিহার-২ ব্লকের পাতলাখাওয়ার এই গ্রামে দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারের সংখ্যাই বেশি। গ্রামের পাশেই রয়েছে কাঠ চেরাই মিল এবং প্লাইবোর্ড ফ্যাক্টরি। দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে স্বামী মকতুল মিয়াঁকে মিলে মিলে ঘুরে কাঠ চেরাই করতে দেখতেন হালিমা। দিনশেষে যা রোজগার হত তা দিয়ে কোনওমতে চলত সংসার। কিন্তু, উপার্জনের জন্য আরেকটা রাস্তা কীভাবে বের করা যায়, সেই চিন্তা দিনরাত মাথায় ঘুরত হালিমার। সেইজন্য স্বামীর সঙ্গে যেতে শুরু করেন কাঠমিলে। দেখতেন, কাঠ চেরাইয়ে পর অনেকটা অবশিষ্ট পাতি পড়ে থাকে। সেই অবশিষ্ট পাতি আবার কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা জানার চেষ্টা করেন হালিমা। জানতে পারেন, টুকরো টুকরো পাতি ছাঁচমতো কেটে সেলাই করে তা প্লাইবোর্ড তৈরিতে কাজে লাগানো সম্ভব। বাইরের মিল থেকে এই কায়দা শিখে এসে একদিন গ্রামের পাশে থাকা কাঠমিলে যান। সেখান থেকে অবশিষ্ট পাতি কিনে এনে বাড়িতেই তা কেটে সেলাই করে নিয়ে যান প্লাইবোর্ড ফ্যাক্টরিতে। সেখানে ভালো দামেই তা বিক্রি করেন। সেদিনের পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি হালিমাকে।

- Advertisement -

কিন্তু একা এই কাজ করা তো সম্ভব নয়, তাই ডেকে নেন গ্রামের ইচ্ছুক মহিলাদের। যাঁরা হাতাখুন্তি নাড়ার পাশাপাশি নিজে হাতে রোজগার করতে চান, এমন কিছু মুখ জোগাড় করেন। তাঁর ডাকে সাড়া দেন আয়েশা বিবি, রুকসানা বেগম, নুরজাহান বিবি, রিংকি বিবির মতো আরও অনেকে।

গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন চলে পাতি কাটার কাজ। একশোরও বেশি মহিলা সংসার সামলে এখন হয়ে উঠেছেন গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা দেখে মুখে স্মিতহাসি হালিমার। বলছেন, পুরুষ মানুষ গায়ে রক্ত জল করে উপার্জন করে ঠিকই। কিন্তু আজকের দিনে মহিলারাও পিছিয়ে নেই। প্রত্যেক মহিলা রোজ ২০০-২৫০ টাকা রোজগার করছে। বাড়ির কাজ সামলে অনায়াসেই এই কাজ করছে সবাই। আয়েশা, রুকসানারা জানালেন, কাঠমিলে বড় গাছের লগ নির্দিষ্ট আকারে কাটার পর প্লাইবোর্ড বানানোর জন্য আবার কাটা হয়। সেখান থেকেও অবশিষ্ট কাঠের পাতি পড়ে থাকে, যেগুলো কোনও কাজে আসে না। সেগুলোই তাঁরা প্রতি কুইন্টাল ৩৫০ টাকা দরে কিনে আনেন। এরপর এক ফুট, দুই ফুট, চার ফুট- এমন বিভিন্ন আকারে ছোট ছোট করে কাটা হয়। সেই ছোট টুকরোগুলো সুতো দিয়ে আবার সেলাই করা হয়। প্লাইবোর্ড ফ্যাক্টরিতে আবার সেগুলো ৮০ পয়সা প্রতি বর্গফুট হিসেবে বিক্রি করা হয়। নুরজাহানের কথায়, আমরাও যে স্বাবলম্বী হয়েছি, এটা ভেবেই অদ্ভুত ভালো লাগে।