গঙ্গারামপুর : দিনগুলো সব কোথায় গেল? তারই উত্তর খুঁজছে গঙ্গারামপুরের তাঁতিপাড়া। বিশ্বকর্মাপুজো আসলেই একসময় সারাদিন ধরে চলত হইহুল্লোড়। পাত পেড়ে চলত মাংস-পোলাও খাওয়া। মিলত পুজোর বোনাস। সেসব দিন যে কোথায় গেল! মনে পড়লে কষ্টই হয়। কথাগুলি বলতে বলতে বুক থেকে যেন একরাশ চাপা যন্ত্রণা বেরিয়ে এল তাঁতশিল্পী উত্তম, মনোরঞ্জন, পুলকদের। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মধ্যে অন্যতম হল হস্তচালিত তাঁত। ছয়ের দশক থেকে গঙ্গারামপুরে হস্তচালিত তাঁতশিল্প গড়ে উঠতে শুরু করে। সুদক্ষ কারিগরদের নিপুণ হাতে আটের দশকে গঙ্গারামপুরের তাঁতের শাড়ি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খ্যাতি লাভ করে। তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ। গড়ে ওঠে অসংখ্য সমবায় সমিতি। সমবায় সমিতিগুলির মধ্যে কয়েক হাজার তাঁতশিল্পী শাড়ি তৈরি করতেন। পাকা রং আর ঘন জমিনের হস্তচলিত তাঁতের শাড়ির ব্যবসা নয়ের দশকে গঙ্গারামপুরে রমরমিয়ে চলতে থাকে। বিশ্বকর্মাপুজো আসলে প্রত্যেক তাঁতির বাড়িতে ধুমধামের সঙ্গে পুজো হত। পুজো ঘিরে দিনভর চলত হইহুল্লোড়। তাঁত শ্রমিকদের জন্য থাকত এলাহি খাবারের আয়োজন। পাত পেড়ে খাওয়ানো হত মাংস-পোলাও। মালিকদের তরফে তাঁতশিল্পীদের দেওয়া হত পুজোর বোনাস সহ নতুন জামাকাপড়। বাড়ত মজুরি। কিন্তু সেসব দিন তাঁতশিল্পীদের কাছে এখন সোনালি অতীত। তাঁতিদের বাড়িতে এখন ধুমধামের সঙ্গে আর হয় না বিশ্বকর্মাপুজো। শ্রমিকদের পাত পেড়ে খাওয়ানো হয় না মাংস-পোলাও। তাঁতশিল্পীরা এখন আর কোনো বোনাস পান না। বাড়ে না মজুরি। শিল্পী উত্তম দাস বলেন, প্রায় ২৫ বছর ধরে তাঁত বুনে আসছি। তৈরি করেছি নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি। সারাবছর বিশ্বকর্মাপুজোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কারণ, ওই দিন মালিকের বাড়িতে ধুমধামের সঙ্গে বিশ্বকর্মাপুজো হত। সেদিন পরিবারের সকলে মালিকের বাড়ির পুজোয় অংশ নিতাম। পুজো শেষে খাওয়াদাওয়া হত। কিন্তু এখন আর মালিকের বাড়িতে সেভাবে বিশ্বকর্মাপুজো হয় না। কারণ, বহু তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। মনোরঞ্জন দাস, পুলক সরকাররা বলেন, একসময় বিশ্বকর্মাপুজো মানেই আমাদের কাছে ছিল বিভিন্ন পদের খাওয়াদাওয়া। নতুন জামাকাপড় ও বোনাস দিতেন মালিকরা। পুজোর পরদিন থেকে শাড়ি তৈরির মজুরি বৃদ্ধি পেত। এখন আর সেই দিন নেই। এখন শাড়ির ব্যবসাও ভালো নেই। এখন নমো নমো করে বিশ্বকর্মাপুজো হয়ে থাকে। গঙ্গারামপুরের তাঁত মালিক রামগোপাল বিশ্বাস, বাবলু বসাকরা বলেন, কয়ে বছর আগেও বাড়িতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টি তাঁত চলত। শ্রমিক সহ প্রায় ৩৫-৪০ জন সবসময় কাজ করত। বিশ্বকর্মাপুজোর ৭ দিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হত। পুজোর দিন শ্রমিকের জন্য মাংস, ভাত, পোলাও-এর ব্যবস্থা করতে হত। শ্রমিকদের দেওয়া হত নতুন জামাকাপড়। তার সঙ্গে বোনাস। মজুরিও বৃদ্ধি হত। এখন তাঁতই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর সেভাবে পুজোই করতে পারি না।