কোজাগরী লক্ষ্মীকে স্মরণ করে আনগুনা গ্রামে প্রকাশিত হয় হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকা

658

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান: প্রতি কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণীমায় প্রকাশিত হয়ে আসছে হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকা। তাও আবার এক আধ বছর ধরে নয়, সুদূর ১৯৪৭ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে ব্যতিক্রমী ‘প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা’। পূর্ব বর্ধমানের রায়না থানার অখ্যাত আনগুনা গ্রামের এমন বিখ্যাত সাহিত্য চর্চার খ্যাতি ইতিমধ্যেই জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যের সাহিত্যিক মহলেও সাড়া ফেলে দিয়েছে।

আনগুনা গ্রামের প্রভাত স্মৃতি সংঘের সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয়ে আসছে এই সাহিত্য পত্রিকা। নামি দামি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিবছর ঝাঁ চকচকে শারদ সংখ্যা প্রকাশ করে পাঠকদের নজর কাড়ে। কিন্তু আনগুনা গ্রামের হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকার কদর আজও নিজগুণেই অটুট রয়েছে। বছর যত গড়াচ্ছে ততই বাংলা সাহিত্য দুনিয়ায় বেড়ে চলেছে ‘প্রভাত সাহিত্য পত্রিকার’ পরিচিতি ও খ্যাতি।

- Advertisement -

কেমন এই সাহিত্য পত্রিকা যা নিয়ে সাহিত্যিক মহলে এত হইচই। উদ্যোক্তারা জানান, আট ইঞ্চি বাই বরো ইঞ্চি মাপের প্রভাত সাহিত্য পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা থাকে দুশোরও বেশি। তাতে থাকে রংবেরং-এর আঁকিবুকি। নামজাদা কবি ও সাহিত্যিক থেকে শুরু করে একেবারে নবাগতদের হাতে লেখা কবিতা ও গল্পগুচ্ছ স্থান পায় এই সাহিত্য পত্রিকায়। পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আনগুনা গ্রামের বাসিন্দারা জানালেন, ১৯৪৭ সালে আনগুনা গ্রামের কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ প্রথম এই সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারপর থেকেই একই ধারায় চলে আসছে এই সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ। এই সাহিত্য পত্রিকায় এখন আনগুনা গ্রামের ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছে। এলাকাবাসী জানান, প্রতি বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন সন্ধ্যায় গ্রামের মন্দিরে লক্ষী ঠাকুরকে সাক্ষী রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয় শারদীয়া প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা। শুক্রবার লক্ষ্মীপুজোর দিন সন্ধ্যায় প্রকাশিত হবে প্রভাত সাহিত্য পত্রিকার ৭৪ তম সংখ্যা।

রাজ্যের শস্যগোলা বলে পরিচিত পূর্ব বর্ধমানের রায়নার প্রত্যন্ত গ্রাম আনগুনা। কৃষি সমৃদ্ধ এই গ্রামের বাসিন্দাদের আরাধ্য দেবী হলেন লক্ষ্মী। কোজাগরী পূর্ণিমায় এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে পুজো করা হয়। এলাকার মূল মন্দিরেও লক্ষ্মী ঠাকুরের পুজোর আয়োজন করা হয়। কর্মসূত্রে বছরের অন্য দিনগুলিতে এই গ্রামের অনেককেই বাইরে কাটাতে হয়। তবে সারা বছর যে যেখানেই কাটান না কেন লক্ষ্মীপুজোর আগে সবাই ফিরে আসেন গ্রামে। লক্ষ্মীদেবীকে সাক্ষী রেখে প্রকাশিত হওয়া প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা আনগুনা গ্রামের ঐতিহ্যকে সুদূর প্রসারি করে তুলেছে।

পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আনগুনা গ্রাম নিবাসী অমিত রায় জানিয়েছেন, কাজী নজরুল ইসলাম, কালীদাস রায় , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, নবনিতা দেবসেন, সত্যজিৎ রায় প্রমুখ খ্যাতনামা লেখক ও সাহিত্যিকদের লেখনীতে সমৃদ্ধ হয়েছে প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা। আগে এইসকল লেখকদের নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিও প্রকাশিত হয়েছে এই সাহিত্য পত্রিকায়। অমিতবাবু জানান, শুধু বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকদের লেখাই এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এমনটা নয়। আনগুনা সহ আশপাশের গ্রামের সাহিত্যপ্রেমী তরুণ তরুণীদের লেখা কবিতা, গল্প সবই গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়ে আসছে।

লক্ষ্মীপুজোর অনেক আগে থেকেই শুরু হয় প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশনার কাজ। উদ্যোক্তারা জানান, লেখক ও সাহিত্যিকরা যে যে লেখা পাঠান তা কোনও ছাপাখানায় পাঠানো হয় না। পত্রিকা প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা সদস্যরা নির্দিষ্ট মাপে কাটা আর্ট পেপারের উপর নিজেরা তা লেখেন। শুধু লেখাই নয় শিল্প নৈপুণ্যতার মাধ্যমে ওই লেখনীকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয় রং ও তুলির ছোঁয়ায়। সুদীর্ঘকাল ধরে এইভাবেই প্রকাশিত হয়ে আসা সাহিত্য পত্রিকাগুলি সযত্নে সাজানো রয়েছে ক্লাবের আলমারিতে, যা অক্ষত রাখতে সারাটা বছরই তৎপর থাকেন ক্লাব সদস্যরা।

অক্লান্ত পরিশ্রম করে এবছরের পত্রিকা প্রকাশনার কাজ সম্পূর্ণ করেছেন আনগুনা গ্রামের এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী। এই গ্রামের উজ্জ্বল বারিক, সুস্মিতা হাজরা, সৌভিক নায়েক প্রমুখ জানান, ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের হাত ধরে মুদ্রণ শিল্পে যতই উন্নতি ঘটুক না কেন তাঁদের হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকার আভিজাত্যটাই আলাদা। সুস্মিতা হাজরার বক্তব্য, প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা বাংলার সনাতন সাহিত্য চর্চার ভাবনাকে সমাদৃত করে রেখেছে। তাই মুদ্রণ শিল্পের ক্রম উন্নতির যুগেও বাংলা সাহিত্য প্রেমীদের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা।