প্যাথলজি পরীক্ষার খরচ বেঁধে দিচ্ছে স্বাস্থ্য কমিশন

369

কলকাতা : বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবাকে নিয়ন্ত্রণে আরও এককদম এগোতে চাইছে রাজ্য স্বাস্থ্য কমিশন। কিছুদিন ধরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য কমিশন হাসপাতাল বন্ধ, জরিমানা ইত্যাদি পথে হেঁটেছে। পরবর্তী পদক্ষেপে প্যাথলজি ও রেডিওলজি সংক্রান্ত পরীক্ষার খরচ বেঁধে দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলিতে ওইসব পরীক্ষায় প্রায়ই যথেচ্ছ চার্জ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। প্রয়োজন ছাড়াও নানারকম পরীক্ষা করার অভিযোগও শোনা যায়। শুক্রবার এইধরনের বেশ কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে শুনানির সময় কয়েকটি  হাসপাতালকে কমিশনের পক্ষ থেকে এব্যাপারে সতর্ক করা হল। কমিশনের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, খুব শীঘ্র প্যাথলজি ও রেডিওলজির বিভিন্ন পরীক্ষার খরচ বেঁধে দেওয়া হবে। এজন্য ইতিমধ্যে দুটি কমিটি তৈরি করে দিয়েছে স্বাস্থ্য কমিশন। কমিটি দুটির রিপোর্ট জমা পড়লে কমিশন পরীক্ষার সর্বোচ্চ খরচ বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

শুক্রবার আবার ডিসান হাসপাতালের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে স্বাস্থ্য কমিশন। এর আগেও এই হাসপাতালকে কমিশনের পক্ষ থেকে দুবার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এদিন বেডভাড়া ও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষায় অত্যধিক বিল করার অভিযোগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে কমিশন। অশোক কুমার চৌরালিয়া নামে এক রোগীকে ৬৫,৪৭৮ টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেয় ওই হাসপাতালকে। স্বাস্থ্য কমিশনের চেয়ারম্যান জানান, ওই রোগী গত ২২ অগাস্ট রাত ২.৪০ মিনিট নাগাদ ভর্তি হন। পরের দিন রাত সাড়ে ৯টায় তাঁর ছুটি হয়। সাকুল্যে এই ১৯ ঘণ্টার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুদিনের বেডভাড়া বাবদ ২৬ হাজার টাকা নেন। ডিসানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হোটেলের মতোই তাদের হাসপাতালে দুপুর ১২টায় চেকিং টাইম। তাই রোগী ১৯ ঘণ্টা থাকলেও হিসেবমতো দুদিনের বিল করা হয়েছে। এছাড়া করোনার জন্য নির্দিষ্ট আইএল-৬ দুবার করা হয়েছে। প্রতিবার সাড়ে ৪ হাজার টাকা চার্জ নেওয়া হয়েছে। সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা নির্ধারক পরীক্ষার চার্জও অত্যধিক নেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত নামী ল্যাবরেটরিতে লিভার ফাংশন টেস্টের জন্য যেখানে ১২৫০ টাকার বেশি নেওয়া হয় না, সেখানে ডিসান কর্তৃপক্ষ ওই টেস্টের জন্য চার্জ করেছে ১৯০০ টাকা। বিচারপতি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এভাবে মাত্র ১৯ ঘণ্টায় ডিসান হাসপাতাল ১,১৫,৪৭৮ টাকার বিল ধরিয়েছে। আমরা হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়েছি, ৬৫,৪৭৮ টাকা রোগীকে ফেরত দিতে। তাদের সতর্ক করে বলেছি, ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে যেন এরকম অভিযোগ না আসে। বিপি পোদ্দার হাসপাতালের বিরুদ্ধেও ৮ দিনে ২,৭২,১৬৯ টাকার বিল করা হয়েছে। সেখানেও সরকারি সার্কুলার এবং কমিশনের কোভিড অ্যাডভাইজারিকে উপেক্ষা করে অত্যধিক চার্জ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলেছে কমিশন। হাসপাতালকে সতর্ক করে দেওয়ার পাশাপাশি রোগীর পরিবারকে কমিশন বলেছে, সমস্যা না মিটলে আবার কমিশনকে জানাতে। হরাইজন লাইফ নামে একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোভিড টেস্ট বাবদ বাড়তি টাকা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য কমিশনে অভিযোগ আসে। ওই হাসপাতাল জানায়, তাদের কোভিড পরীক্ষার আইসিএমআর-এর লাইসেন্স নেই। তাই বাইরে থেকে টেস্ট করিয়ে আনায় বেশি চার্জ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কমিশন সরকার নির্ধারিত ২২৫০ টাকা চার্জ রেখে বাকি  ৫৬০০ টাকা রোগীর পরিবারকে ফেরত দিতে বলেছে।

- Advertisement -

মেডিকা হাসপাতালের বিরুদ্ধেও প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য বেশি চার্জ নেওয়ার অভিযোগ আসে। মেডিকা কর্তৃপক্ষ জানান, এখনও চূড়ান্ত বিল দেওয়া হয়নি। বিমা কোম্পানির টাকা পাওয়ার পর বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়া হবে। দুর্গাপুরের মিশন হাসপাতালকেও এদিন ২৫ হাজার টাকা জমা রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য কমিশন। ১৭ বছরের একটি ছেলেকে মিশন হাসপাতালে করোনা উপসর্গ সহ নিয়ে গেলে তারা ফিরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ। পরে ওই রোগীকে অন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মিশন হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের হাসপাতালে বহু কর্মী একসঙ্গে করোনা সংক্রামিত হওয়ায় তাদের পক্ষে রোগী ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য কমিশন এতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। কমিশনের বক্তব্য, ভর্তি করতে না পারলে অ্যাম্বুলেন্সে করে স্থানীয় কোনও হাসপাতালে পাঠিয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করা যেত। সেজন্যই ওই হাসপাতালকে ২৫ হাজার টাকা জমা রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদপত্রে এক রিকশাচালকের দুর্ভোগের খবর পেয়ে স্বাস্থ্য কমিশনের কর্তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এদিন তাঁর রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা করলেন। জানা গিয়েছে, করোনায় কাজ হারানো এক ভদ্রলোক কিছু সমাজসেবীর সঙ্গে ভ্যান-রিকশা চালিয়ে খাবার বিতরণের কাজ করতেন। তাঁর পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে গেলেও আধার কার্ড না থাকায় কোনও হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। কমিশনের কর্তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলে তাঁর প্লাস্টিক সার্জারির ব্যবস্থা করে দেন। বৃহস্পতিবার তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কমিশনের এক কর্তার কথায়, এত মানুষের দুর্ভোগ দেখতে দেখতে আমরা নিজেরা মানসিকভাবে কিছু করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছি। এটা হয়তো তারই প্রতিফলন।