উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে সাপের আস্তানা

299

হরিশ্চন্দ্রপুর : উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে বিষধর সাপের আনাগোনা। লাগাতার বৃষ্টির জেরে ছাদেও জল জমেছে। এমনকি ফুলহরের জল বাড়তে বাড়তে এসে পৌঁছেছে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পিছনে। ভগ্নপ্রায় এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত দেখাও মেলে না স্বাস্থ্যকর্মীদের। ঘটনাটি হরিশ্চন্দ্রপুর-২ নম্বর ব্লকের সবেধন নীলমণি দক্ষিণ ভাকুরিয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের। ঘটনায় ক্ষুব্ধ হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার ইসলামপুর পঞ্চায়েতের দক্ষিণ ভাকুরিয়া এলাকার বাসিন্দারা। বিএমওএইচ সাগর বসাক বলেন, ‘ব্লকের বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সংস্কার প্রযোজন। ওই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে এখনও আমার কাছে কোনও অভিযোগ আসেনি। তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ আমি খতিয়ে দেখব।’ ইসলামপুর পঞ্চায়েত প্রধান সুষমা মণ্ডল বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য সমস্যার ব্যাপারে বিডিওকে জানানো হবে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ১০ বছর আগে এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তৈরি হয়। কিন্তু তারপর থেকেই কোনও ডাক্তার বা নার্সের দেখা মেলেনি। সপ্তাহে একদিন করে আশাকর্মী এবং এএনএম দিদিরা আসেন। কিন্তু বাকি দিনগুলি চিকিত্সা পরিষেবা থেকে বঞ্চিত এলাকার মানুষ। ব্লক প্রশাসন থেকে স্বাস্থ্য দপ্তর এমনকি জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ জানিয়ে আসছি বহুদিন ধরে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রতিবারের মতো এবছরও জল বেড়েছে ফুলহরে। এলাকায় জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে সাপের উপদ্রব। একদিকে ফুলহরের জল, অন্যদিকে সাপের উপদ্রব নিয়ে দিন কাটছে এলাকার মানুষজনের। স্থানীয় বাসিন্দা অনুজ মণ্ডল বলেন, ‘এলাকায় উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভগ্নপ্রায় দশা। বৃষ্টির ও নদীর জল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক তলায় ঢুকে পড়েছে। ফাটল ধরেছে নীচের মেঝেতে। একতলার সব ঘরেই সাপের বাসা। ওপর তলার ছাদও ভগ্নপ্রায়। ছাদে জল জমছে। ছাদ ফুটো হয়ে সেই জল ঘরে চুঁইয়ে পড়ছে। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মীরা এখানে বসেন না। তাই রাতবিরেতে চিকিৎসা পরিষেবা পেতে এলাকার মানুষকে নৌকা করে ওপারে গিয়ে হয় মশালদহ কিংবা হরিশ্চন্দ্রপুর ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হয়। প্রতিবার ভোটের সময় নেতারা এখানে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। কিন্তু ভোট পার হলে তাঁদের আর প্রতিশ্রুতি মনে থাকে না।’

- Advertisement -

স্থানীয় বাসিন্দা মন্টু যাদব বলেন, ‘১০ বছর আগে এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোনও সুযোগসুবিধা পাইনি, আজ পর্যন্ত ডাক্তারের দেখা মেলেনি। প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে নার্স আসতেন। এখন সপ্তাহে একদিন আশাকর্মীরা এসে মেয়েদের ট্যাবলেট ও ইনজেকশন দিয়ে যান। চারিদিকে জল। রাতে কারও কিছু হলে চিকিত্সার কোনও ব্যবস্থা নেই। বারোমাস আমরা এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করছি। কেউ দেখার নেই।’ স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য মঞ্জু সাহা বলেন, ‘উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দশা খুবই খারাপ। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ছাদ ফেটে গিয়েছে। বর্ষার জলে দোতলা ভেসে যাচ্ছে। এদিকে ফুলহরের জল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পিছনে চলে এসেছে। বৃষ্টির জল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক তলায় গিয়ে জমা হচ্ছে। মেঝেতেও ফাটল ধরেছে। তার উপর সাপের আনাগোনা।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই প্রাণ হাতে করে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য আমি বারবার ব্লক প্রশাসন, স্বাস্থ্য দপ্তর এমনকি জনপ্রতিনিধিদের কাছে ছুটে গিয়েছি। আগের ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিককে অভিযোগ জানিয়েছিলাম।’

ইসলামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সুষমা মণ্ডল বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। কিছুদিন আগে ওই কেন্দ্রের এক কর্মী করোনা সংক্রামিত হয়েছিলেন। তাই মাঝে অনুপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় পঞ্চায়েতের তরফে আমি ইতিমধ্যেই ওখানে লোক পাঠিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ব্যবস্থা করেছি। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামোগত যে সমস্যা রয়েছে, তা আমি বিডিও-র নজরে আনব।’ হরিশ্চন্দ্রপুর-২ নম্বর ব্লক রোগীকল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান তজমূল হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’ এলাকার জেলা পরিষদ মেম্বার তথা শিশু, নারী ও ত্রাণ কর্মাধ্যক্ষ মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘ওই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে এলাকাবাসীর দাবি যুক্তিসংগত। আমি আগামীদিনে জেলা পরিষদের মিটিংয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টি তুলব। এছাড়া বিষয়টি জেলা শাসকের নজরে আনা হবে।’

বিএমওএইচ সাগর বসাক বলেন, ‘হরিশ্চন্দ্রপুর-২ নম্বর ব্লকে ৩৩টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংস্কারের প্রযোজন। নদী পাড়ের মানুষজন যাতে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা পান, সেজন্য আমরা রশিদপুর সাব-সেন্টার, খোপাকাটি সাব-সেন্টার এবং ইসলামপুর জিপির হেড সেন্টারে প্রযোজনীয় ওষুধপত্র রেখেছি। ওই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে আমার কাছে কোনও অভিযোগ আসেনি। তবে ওই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে যে অভিযোগ গ্রামবাসীরা করছেন, সেটি অবিলম্বে আমি খতিয়ে দেখব। এছাড়াও এলাকার বিভিন্ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিকাঠামোগত যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলি বিষয়ে আমরা প্ল্যান এস্টিমেট করে ব্লক প্রশাসনের মাধ্যমে জেলায় পাঠাব।’

তথ্য-সৌরভকুমার মিশ্র