অন্যকে দিলেও টিকা নিচ্ছেন না স্বাস্থ্য সহায়িকারা

153

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : ভারতবর্ষ বহু আন্দোলন দেখেছে। ইংরেজের উপর ক্ষুদিরাম বসুর বোমা ছোড়া থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধির বিশ্বপ্রসিদ্ধ গান্ধিগিরি। এর আগে বা পরেও দেশ বহু সরব বা নীরব আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে। হালে গোটা রাজ্যজুড়ে আরও এক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। সম্ভবত অনেকেরই চোখের আড়ালে। গত কয়েকটা মাস করোনা ভাইরাস আমাদের হাড়মাস এক করে ছেড়েছে। কাছের কত মানুষ আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গিয়েছেন। ভাইরাসকে কাবু করতে বিজ্ঞানীরা দিনরাত এক করে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। প্রথম পর্যায়ে ফ্রন্টলাইন কোভিড যোদ্ধা হিসেবে স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকাকরণের আওতায় আনা হয়েছে। মূলত স্বাস্থ্য সহায়িকারা টিকা দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। বেতন বঞ্চনার দাবিতে এই স্বাস্থ্যকর্মীরা বহুদিন ধরে সরব হলেও এখনও পর্যন্ত তাঁদের সমস্যার কোনও সুরাহা হয়নি। প্রতিবাদে তাঁরা অভিনব আন্দোলনে নেমেছেন। অন্যকে টিকার ইনজেকশন দিলেও নিজেরা ভ্যাকসিন নিচ্ছেন না। এ কাজে যুক্ত প্রায় ১৫ হাজার কর্মীর মধ্যে এখনও পর্যন্ত ১০ শতাংশও ভ্যাকসিন নেননি। অভিনব এই ভ্যাকসিন বয়কটের জেরে সংশ্লিষ্ট মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
আন্দোলনরত স্বাস্থ্য সহায়িকা এবং সুপারভাইজারদের সংগঠন জয়েন্ট ফোরামের রাজ্য সম্পাদক মার্থা ঘোষ বলেন, ২০১৮ সালে আমাদের নার্সিং ক্যাডার থেকে বের করে অন্য শ্রেণিতে ফেলা হয়। আজ আমরা মাঠঘাটের কর্মীতে পরিণত হয়েছি। প্রোমোশন থেকে বেতনক্রম, সর্বত্রই বঞ্চনার শিকার। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরে বহুবার আবেদন জানানো হলেও কেউই আমাদের দিকটা ভাবেননি। তাই আমরা সবাইকে টিকা দিলেও এই বঞ্চনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিকা নেব না বলেই শপথ নিয়েছি। এ বিষয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, কিছু জানি না। দপ্তরে জিজ্ঞাসা করুন। করোনা মোকাবিলায় উত্তরবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সুশান্ত রায় অবশ্য বলেন, নিজের সুরক্ষার জন্য প্রত্যেককে  টিকা নিতে বলা হয়েছে। তবে টিকা নেওয়ার বিষয়টি পুরোটাই ভ্যাকসিন গ্রাহকের ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল। কেউ টিকা না নিতে চাইলে আমাদের কিছু বলার নেই। তবুও সহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বলছি, পেশাগত দাবি চিরকাল ছিল, আছে ও ভবিষ্যতেও থাকবে। টিকাকরণ করে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে নিজেরা যাতে টিকা নেন এবং নিজেদের পাশাপাশি পরিবারকে সুরক্ষিত রাখেন সেজন্য তাঁদের অনুরোধ করছি। জলপাইগুড়ির বিজেপি সাংসদ ডাঃ জয়ন্ত রায় বলেন, যে স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা টিকাকরণের মতো ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছেন তাঁদেরও বঞ্চনার শিকার হওয়ার বিষয়টি খুবই লজ্জাজনক। অবিলম্বে স্বাস্থ্য সহায়িকাদের দাবি মেনে তাঁদের সঠিক মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্রের খবর, সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় আনা হলেও মূলত স্বাস্থ্য সহায়িকারাই টিকাকরণের দায়িত্বে রয়েছেন। গোলাপি দিদিমণি হিসেবে পরিচিত এ রাজ্যের স্বাস্থ্য সহায়িকা এবং সবুজ শাড়ি পরিহিত সুপারভাইজাররাই এ কাজ করছেন। এঁদের হাত দিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ভ্যাকসিন নিয়েছেন। কিন্তু বেতন বঞ্চনার প্রতিবাদে এই স্বাস্থ্য সহায়িকারা নিজেরা ভ্যাকসিন নিচ্ছেন না। সারা রাজ্যে স্বাস্থ্য সহায়িকা ও সুপারভাইজার মিলে টিকাকরণের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১৫ হাজার কর্মীর মধ্যে বেতনক্রমের দাবিতে এ পর্যন্ত ১০ শতাংশ কর্মীও নিজেরা টিকা নেননি। টিকা বয়কটের কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য সহায়িকারা করোনার সময় ঘোষিত উৎসাহ ভাতায় বঞ্চনাকেও তুলে ধরেছেন। করোনা মোকাবিলার সময় কর্মরত কমিউনিটি হেলথ সুপারভাইজারদের জন্য ন্যাশনাল হেলথ মিশন থেকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা উৎসাহ ভাতা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য সহায়িকারা সেই ভাতার দাবি জানালেও প্রথমে রাজ্য সরকার তা দেয়নি। এরপর কর্মীরা তা মিশনের রাজ্য অধিকর্তাকে জানালে রাজ্যের তরফে পাঁচ হাজারের পরিবর্তে তাঁদের মাসিক দেড় হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। স্বাস্থ্য সহায়িকারা এটাকেও বঞ্চনা হিসেবেই দেখছেন। টিকাকরণ শুরুর আগে এ বিষয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালকে জানালেও কোনও সদুত্তর মেলেনি বলেই অভিযোগ।
মালবিকা বর্মন নামে এক স্বাস্থ্য সহায়িকা বলেন, সরকারি হিসেবে পাঁচ হাজার মানুষ পিছু একজন স্বাস্থ্য সহায়িকা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা ২০-৩০ হাজার মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিচ্ছি। অথচ আমাদের বঞ্চিত করে জিএনএমদের প্রোমোশন দিয়ে কমিউনিটি হেলথ অফিসার করা হচ্ছে। আমরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাঁদের রিপোর্ট এনে দিচ্ছি। ওঁরা সেই রিপোর্ট উপরমহলে পাঠিয়ে উৎসাহ ভাতা পাচ্ছেন। এজন্যই আমরা সকলকে টিকা দিলেও নিজেরা নেব না।