অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাবেন স্বাস্থ্যকর্মীরা

99

শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার : গৃহবধূ জয়া সিংহরায়ের সমস্যাটা এখন অনেক বাবা-মায়েরই চেনা সমস্যা। লকডাউনে স্কুল বন্ধ থাকায় অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছিল। তাই ছেলের হাতে মোবাইল ফোন দিতেই হয়েছিল। এখন ছেলের মোবাইল ফোনে আসক্তি এতটাই যে, বিকেলে বাইরে খেলতে যেতে বললেও সে যেতে চায় না। বাবা-মায়ের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে যাওয়ার বদলে সে মোবাইল সার্ফিং করতেই বেশি পছন্দ করে। বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ছেলের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিলেই সে রেগে যাচ্ছে।

কোচবিহারের দেবীবাড়ি এলাকার এক যুবক একটি নামী বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন। লকডাউনে বেশ কিছুদিন ওয়ার্ক ফর্ম হোম করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজ চলে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফের নিযোগের কথা থাকলেও এখনও পর্যন্ত তা হয়নি। কাজ হারিয়ে মানসিক অবসাদে ভুগছেন ওই যুবক।

- Advertisement -

করোনা পরিস্থিতিতে নানা কারণে মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা বন্ধুবান্ধবের সংসর্গ হারিয়ে একাকিত্বের হাত থেকে বাঁচতে ঝুঁকে পড়েছে মোবাইল ফোনে। তাতেও শেষরক্ষা হচ্ছে না। কিছুদিন পর কেউ মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, কেউ বা খিটখিটে মেজাজের হয়ে পড়ছে। আবার কেউ কথা বলাই বন্ধ করে দিচ্ছে পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গে।

স্বাস্থ্য দপ্তরের সমীক্ষা বলছে, করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারায় এখনও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ এখনও খোলেনি। আবার লকডাউন পরিস্থিতিতে কাজ হারিয়েছেন বহু মানুষ। ফলে অন্তত ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এই পরিস্থিতিতে অবসাদগ্রস্তদের কাউন্সেলিংয়ে খুবই প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। আর সেজন্য এবার মানসিক অবসাদগ্রস্তদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য দপ্তর বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে খবর, জেলায় জেলায় মানসিক অবসাদগ্রস্তদের কাউন্সেলিংয়ের জন্য অগজিলিয়ারি নার্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি (এএনএম)-দের এবং আশাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। খুব শীঘ্রই তাঁদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে। তাঁরাই তৃণমূলস্তরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝাবেন মানসিক অবসাদ সম্পর্কে। কীভাবে তার মোকাবিলা করতে হবে, সেটাও তাঁরা বোঝাবেন।

কোচবিহারের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ রণজিৎ ঘোষ বলেন, করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক অবসাদ বাড়ছে। সেজন্য মানসিকভাবে একজন কীভাবে সুস্থ থাকতে পারেন, তাঁর কী কী করণীয়, এসব বিষয়ে বোঝানোর জন্য জেলার এএনএম এবং আশাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করবেন। এ কাজে স্থানীয় ক্লাবগুলিরও সহযোগিতা নেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা আরও জানিয়েছেন, এক দশক আগেও ছোঁয়াচে রোগে বেশি আক্রান্তের হদিস মিলত। তবে বর্তমানে রোগের প্যাটার্ন বদলে গিয়েছে। অসংক্রামক রোগেই মৃত্যুর সংখ্যা এখন বেশি। অর্থাৎ কলেরা, ডায়ারিয়া, টাইফয়েড, ডেঙ্গি, ক্যানসারের মতো রোগ নয় বরং হৃদরোগ, হাই ব্লাডপ্রেশার, ডায়াবিটিস, স্ট্রোক এ ধরনের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে বহু মানুষ অবসাদে ভুগছেন। আবার অবসাদগ্রস্তদের অধিকাংশই তাঁর চিকিত্সার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছেন না। সেজন্য সমস্যা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

এমজেএন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনির্বাণ মজুমদার বলেন, বর্তমানে মানসিক অবসাদে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। করোনা থেকে ভীতি যেমন রয়েছে তেমনই লকডাউনে ঘরবন্দি হয়ে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে অনেকেই। কেউ কেউ আবার লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যেও মানসিক অবসাদ দেখা যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য সবসময় ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের উচিত তাঁদের উৎসাহ দেওয়া। খবরের কাগজ, গল্পের বই পড়া, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে গল্পগুজব করেই সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ চিরঞ্জীব রায় বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে অন্তত ৩০ শতাংশ মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে চট করে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তবে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, পরিবারের সহায়তা ও চিকিৎসকদের পরামর্শে অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

কোচবিহার জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে, জেলায় প্রায় ৮৫০ জন এএনএম কর্মী ও হাজারের বেশি আশাকর্মী রয়েছেন। ধাপে ধাপে প্রত্যেককেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। মানসিক অবসাদ থাকলে কী করা উচিত, নেশামুক্তির উপায়, মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্তি কাটিয়ে ওঠার সম্পর্কে তাঁদের বোঝানো হবে। পরবর্তীতে গ্রামগঞ্জে ঘুরে তাঁরাই কাউন্সেলার হিসাবে কাজ করবেন। সাধারণ মানুষকে অবসাদমুক্ত হওয়ার পথ দেখাবেন।