অবহেলায় পড়ে উত্তরের কত ইতিহাস, প্রত্নসম্পদ

630

শিলিগুড়ির জন্মের আগে ফাঁসিদেওয়া ছিল সিকিম রাষ্ট্রের অধীনে। ১৮৩৫ সালে এলাকাটি ব্রিটিশ সরকারের হাতে আসে। আদালত ছিল ফাঁসিদেওয়ায়। সেটাই পরে শিলিগুড়িতে আসে। সেই ইতিহাস পাদপ্রদীপের আলোয় এলই না। লিখেছেন গৌরীশংকর ভট্টাচার্য।

লোকায়ত সংস্কৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার আনাচকানাচে ছড়িয়েছিটিয়ে অনাদরে অবহেলায় পড়ে আছে। পুরাতত্ত্বপ্রেমী, নৃতত্ত্ব গবেষক, পর্যটক, সাধারণ মানুষের কাছে এসব পরম বিস্ময়ে। হাতির পিঠে চেপে গন্ডার, গাউর দর্শন রোমাঞ্চকর নিশ্চয়ই। কিন্তু তার চেয়ে অনেক রোমাঞ্চ, বিস্ময় জাগিয়ে তোলে শতাব্দীপ্রাচীন নানা মন্দির, টেরাকোটা অলংকার, রাজবাড়ি, দিঘি, মাটি খুঁড়ে আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্ব, দিনহাটার অদূরে গোসানিমারির রাজপাট, গঙ্গারামপুরের বানগড়, চিলাপাতা জঙ্গলের ইতিহাস ও কিংবদন্তির জটাজালে আচ্ছন্ন নলরাজার গড়ের প্রত্নতত্ত্ব। স্থাপত্য ও প্রাচীনত্বের মোড়কে অভিনব স্থান মালদার জগজীবনপুরের বৌদ্ধ বিহার। জায়গাটির আসল নাম তুলাভিটা। মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার হয়েছে পাল যুগের ধ্বংসাবশেষ। এই প্রত্নতত্ত্ব সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এসব সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের কোনও হেলদোল নেই। আলিপুরদুয়ারের কাছে বিষ্ণুমন্দির, সান্তালাবাড়ি ছাড়িয়ে ঐতিহাসিক বক্সা দুর্গ, যার চোদ্দো আনাই এখন বক্সা ঝোরার গর্ভে নিমজ্জিত। রক্ষণাবেক্ষণের জায়গার কিন্তু শেষ নেই। শামুকতলার কাছে মজিদখানা ও আলিপুরদুয়ার শহরের পাশে বনচুকামারির মসজিদ, চেচাখাতার দুর্গ, হিংগুলাবাস, ছিপড়াগ্রাম, উত্তর দিনাজপুরে ইসলামপুরের প্রাচীন মসজিদ, বাহিন রাজবাড়ি, ইটাহারের জমিদারবাড়ি, দুর্গাপুর রাজবাড়ি ইত্যাদি সবই আসলে হেরিটেজ সাইট। তালিকা প্রস্তুত করলে এত দীর্ঘ হবে যে, খেই হারিয়ে ফেলব।

- Advertisement -

এর বাইরে লেখালেখি, পুঁথিপুস্তক বিস্তর রচিত হলেও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ বলে কিছু নেই। ঢিলেঢালা নজরদারির কারণে দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন মূর্তি, মুদ্রা, বাদ্যযন্ত্র, অলংকার, বাসনপত্র চুরি হয়ে অন্য দেশে পাচার হয়ে গিয়েছে এবং যাচ্ছে। এ নিয়ে উত্তরবঙ্গবাসীর অনেক ক্ষোভ-দুঃখ-অভিমান জমা হয়ে থাকলেও প্রতিকারের কোনও ব্যবস্থা নেই এখনও। উত্তরবঙ্গে হেরিটেজ কমিশন কমিটি গঠিত হয়েছে ছয়টি জেলার জন্য। বিদগ্ধ প্রতিনিধিরা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে মতামতও দিয়েছেন। কিন্তু অবস্থার বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি। কিছু কিছু প্রত্নসম্পদ, দুর্লভ বস্তু নানা সংগ্রহশালায় অবশ্যই আছে। কিন্তু বাইরে যেসব জিনিস অরক্ষিত অবস্থায়, সেসবের বড় করুণ অবস্থা। আমার শহর শিলিগুড়ি থেকেই শুরু করা যাক। তরাই জনপদে হেরিটেজ গন্ধমাখা টাউন স্টেশনের বারো আনাই ভ্যানিশ। জরাজীর্ণ কঙ্কালসার, অযত্ন-অবহেলার নিদর্শন। ১৮৭৯ সালে শিয়ালদা থেকে প্রথম দার্জিলিং মেল আসে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনে। মার্ক টোয়েন, ছোটলাট-বড়লাট, বিপ্লবী বাঘা যতীন থেকে শুরু করে কত মহাপুরুষ, মনীষী, দার্শনিক, পর্যটক, চারণিকের পদধূলিতে ধন্য টাউন স্টেশন। মেসার্স ডি সোরাবজির মালিকানায় রিফ্রেশমেন্ট রুম ছিল, সেখানে ছিল খানদানি রেস্তোরাঁ। কালো চামড়ার প্রবেশ সেখানে নিষেধ। শোনা যাচ্ছে স্টেশন বাড়িটি সাজিয়ে তোলা হবে। কিন্তু রেলের সম্পত্তি তো বারো ভূতে লুটে নিয়েছে। বেহাত হয়ে গিয়েছে সব। কীভাবে উদ্ধার হবে? রাজনীতির দাদাবাবুরা এই লুঠের পশ্চাতে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য একটাই, এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই। হেরিটেজ কমিটির লোকজন দেখে গিয়েছেন। মতামত দিয়েছেন। কিন্তু অবস্থা যে কে সেই।

শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকার রেলস্টেশনগুলি আজও দেখলে মনে পরম বিস্ময় জাগে। সুকনা থেকে রংটং, তিনধারিয়া, কার্সিয়াং, টুং, সোনাদা, ঘুম হয়ে দার্জিলিং। ব্রিটিশ জমানার রেলস্টেশন সোনাদা পুড়ে গেল। কিন্তু আর আগের মতো করার উদ্যোগ নেওয়া হল না। শুধু কী স্টেশন, বিভিন্ন চা বাগানে দেড়শো-দুশো বছরের পুরোনো বাংলোগুলিও নজরকাড়া। অনেক পর্যটক হেরিটেজ বাংলোগুলিতে থাকতে ভালোবাসেন, কিন্তু এগুলির সংরক্ষণের কোনও ভাবনা নেই কোনও মহলে। তেমনই আকর্ষণ আছে বনবাংলোগুলির। সুকনা থেকে রায়ডাক, গরুমারা, চাপড়ামারি, ঘুন্টিমারি- সর্বত্র দেখবেন হেরিটেজ ফ্লেভার। প্রতিটি বনবাংলোকে অবিকৃত রাখা সরকারের কর্তব্য। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, ইসলামপুর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর যেখানেই যাই, আমি খুঁজে বেড়াই পুরাতন প্রত্নসম্পদ, রাজা-জমিদারদের বাসগৃহ। কোথাও সামান্য রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে, কোথাও খণ্ডহর-ভূতুড়ে প্রাসাদ যেন ক্ষুধিত পাষাণ। যেমন, কালিম্পংয়ের গৌরীপুর হাউস, মর্গান হাউস রহস্য-রোমাঞ্চে ভরপুর। উত্তরবঙ্গে নানাবিধ হেরিটেজ সম্ভারের আরেক নিদর্শন বাঘপুল, যার আরেক নাম করোনেশন ব্রিজ। অসাধারণ সৌন্দর্যময় এই সেতুটি বর্তমানে বিপজ্জনক অবস্থায়। সেতুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা আজও হল না। যে কোনও দিন অঘটন ঘটার সম্ভাবনা নিয়ে রয়েছে সেতুটি।

শিলিগুড়ির জন্মের আগে ফাঁসিদেওয়া ছিল সিকিম রাষ্ট্রের অধীনে। সূর্যাপুর জঙ্গলে ফাঁসিদেওয়া ঠাকুরের পুজো হত। এখানে অপরাধীদের ফাঁসিও দেওয়া হত। ১৮৩৫ সালে সিকিম রাষ্ট্রের হাত থেকে এলাকাটি ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে আসে। তখন ফাঁসিদেওয়া ছিল দার্জিলিং জেলার একটি মহকুমা। ১৮৭২-৭৫ সালে মহকুমা আদালতটি সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয় শিলিগুড়িতে। ফাঁসিদেওয়ার কৌলীন্য তারপর থেকে স্তিমিত হতে থাকে। দুর্ভাগ্য হল, ফাঁসিদেওয়ার সেই ইতিহাস আজও পাদপ্রদীপের আলোয় এলই না। এসব নিয়ে ভাবার কেউ নেই। হেরিটেজের মক্কা বলা যায় শৈলরানি দার্জিলিংকে। শুধু খেলনা ট্রেন বা পাঙ্খাবাড়ি রোড নয়। দার্জিলিংয়ে পাশাপাশি কার্সিযাং, কালিম্পংয়ে এখন চোখে পড়ে এক শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন ঘরবাড়ি। শৈলশহর দার্জিলিংয়ে ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে অগণিত হেরিটেজ সম্পদ। বেশ কিছু বেহাত, বেদখল, হস্তান্তর হয়ে গিয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের নামগন্ধ নেই। কিছু অবশ্য সরকারিভাবে দেখভাল হয়। ভগিনী নিবেদিতা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্মৃতিবিজড়িত বাসগৃহ পর্যটক, উত্সাহী গবেষকরা দেখতে যান। কজনে জানেন বা খবর রাখেন লালকুঠির পুরাতন ইতিহাসের কথা। একদা কলিংটন ছিল কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের তৈরি। এই লালকুঠির স্মৃতিচারণায় জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবী এখানে এসে আনমনা হয়ে পড়তেন। এখানেই শুটিং হয়েছিল বিখ্যাত সিনেমা অনুসন্ধান-এর।

অনেকে জানেন না, স্যর যদুনাথ সরকারের বাড়ি ডিবি গিরি রোডে অবস্থিত। যেখানে পরবর্তীকালে থাকতেন এভারেস্ট বিজযী তেনজিং নোরগে। শরৎচন্দ্র দাস, যিনি কয়েকবার লাসা বেড়াতে গিয়েছিলেন, তিব্বতি ভাষা নিয়ে গবেষণা করতেন, তাঁর বাড়ির কথা কজনে জানেন? বিস্মৃতির তলে হাঙ্গেরির অসামান্য পণ্ডিত আলেকজান্ডার কোমাডো কোরেস। তিব্বতি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তাঁর সমাধি দেখতে পাবেন। পরিব্রাজক, সুলেখক, উদ্ভিদবিদ জোসেফ ডালটন হুকার ও ডঃ হজসনের স্মৃতিবিজড়িত বাসস্থান সেন্ট পল স্কুলের একাংশে। মহারানি গার্লস স্কুলের স্মৃতি সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের লেখায় আমরা পাই। এসব নিয়ে এখন কোনও চর্চাও নেই। বরং রাজনৈতিক ডামাডোলে বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে। কজনে খবর রাখেন মংপুর অদূরে সুরেল বাংলোর কথা। স্বামী বিবেকানন্দ এবং অভেদানন্দের স্মৃতিবিজড়িত বাসগৃহ এখন আর খুঁজে পাবেন না। পাঙ্খাবাড়িতে ছিল ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজের স্মৃতিবিজড়িত বাসগৃহ। কজন তার খবর রাখেন? শতবর্ষেরও বেশ প্রাচীন পাঙ্খাবাড়ি ডাকঘর যেমন, তেমনই আছে। হারিয়ে গিয়েছে শুধু পাঙ্খাপুলার, পুরাতন বাংলো, যেখানে হুকার, ক্যাম্পবেল, ফ্রেডপিন, প্রেস্টিজ প্রমুখ বিখ্যাত লোক রাত্রিযাপন করেছেন।

দার্জিলিংয়ে মতো কালিম্পংয়ে হেরিটেজ সম্পদের ছড়াছড়ি। রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষপ্রান্তে কালিম্পংয়ে এসেছিলেন। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত গৌরীপুর হাউস কালিম্পংয়ের গর্ব। বাড়িটি তৈরি করেছিলেন ময়মনসিংয়ের জমিদার বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। এই গৌরীপুর হাউসে বসে রবীন্দ্রনাথ আকাশবাণীতে কবিতা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। কবির স্মৃতিবিজড়িত সবই পড়ে আছে, কিন্তু আন্তরিকভাবে দেখাশোনা কিছুই হয় না। হেরিটেজ কমিটির সদস্যরা জানি না কী ভাবছেন। জলপাইগুড়ি জেলা ভাগ হলেও হেরিটেজ সম্পত্তি যা ছিল, তা তেমনই আছে। একবার রাজবাড়ির অন্দরে ঢুকে বর্তমান রাজামশাইয়ে সঙ্গে চা পান করেছিলাম এবং  ভিতরে-বাইরে পর্যবেক্ষণ করি। জনগণ তথা পর্যটনের স্বার্থে রাজবাড়ির কিছু অংশ যদি সাজিয়েগুছিয়ে তোলা হত, তাহলে হেরিটেজ বলা সার্থক হত। রাজবাড়ির বিপরীত দিকে পুকুর, শিবমন্দির এখনও নজর কাড়ে। প্রায় অবিকৃতই আছে। জলপাইগুড়ির প্রচুর ঘরবাড়ি, মন্দির, মসজিদ, শতবর্ষের বেশি প্রাচীন ঘরবাড়ি এখনও টিকে আছে, যা অনায়াসে ঐতিহ্যবাহীর তকমা পেতে পারে। তবে রক্ষা করা না গেলে আগামীদিনে প্রোমোটারদের থাবায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এসব সম্পদ। তিস্তা উদ্যানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আজও চোখে পড়ে লাল ইটের অট্টালিকা, কড়িবরগার ছাদ, খড়খড়ির জানলা, সামনে সবুজ লন। সামনে-পিছনে গাছপালা। মূলত জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের জন্য বরাদ্দ এই বাড়িগুলি।

কোচবিহারে রাজবাড়ি বাদ দিলেও রাজ আমলের কিছু ঘরবাড়ি যেমন ভিক্টর প্যালেস টিকে আছে এখনও। রাজাদের প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলি যত্ন নিয়ে রক্ষা করা হচ্ছে। পুরাতন ঘরবাড়ির প্রতি গভীর টান, আকর্ষণ বা কৌতুহল, যাই বলুন, বনাঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে রাত্রিযাপন করতে কাঠের বাংলোতেই থাকতে ভালো লাগে। একদা শিলিগুড়িতে ৯৮ ভাগ বাড়ি ছিল কাঠনির্মিত। এখন প্রায় ভ্যানিশ। মালদা জেলার পুরাকীর্তি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য শুধুমাত্র গৌড় ও পাণ্ডুয়াকে ঘিরে নয়। পুরাতন মালদা, পুরাটুলি থেকে চাঁচল, রাজবাড়ির মন্দির, বর্ধিষ্ণু কলিগ্রাম, বকচরার পাশাপাশি রায়গঞ্জের আশপাশে বাহিন, দুর্গাপুর রাজবাড়ি, বিন্দোল মন্দির, কালিয়াদিঘি, বুরহান নদী, পুরাতন মসজিদ, ইসলামপুরের জমিদার বাড়ি, বোলোঞ্চা পুরাতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা পর্যটকের নজর কাড়ে। উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতি, সভ্যতার ধারক-বাহক এই হেরিটেজ সম্পদ কিন্তু ধীরে ধীরে অবলুপ্তি বা নষ্ট হওয়ার পথে। এখনই পদক্ষেপ না করলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।