উচ্চমাধ্যমিকে নজর কাড়ল হোমের দুস্থ অসহায় ছাত্ররা

181

তনয় মিশ্র, মালদা: মালদার এই সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত হোম থেকে লেখাপড়া করে এবার উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করে নজর কেড়েছে তিন আবাসিক। সফল ছাত্ররা সকলেই কাজিগ্রাম চণ্ডিপুর বিআরএস হাই স্কুলের ছাত্র। তাঁরা তিনজনেই ৮৫ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। তাঁদের সাফল্যে খুশি হোম কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন থেকে শুরু করে পরিবারও।

মালদার একটি সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত হোম থেকে লেখাপড়া করে এবার উচ্চমাধ্যমিকে নজর কেড়েছে আদিবাসী দুস্থ অসহায় আবাসিক ছাত্ররা। জেলার দুস্থ অসহায় ছাত্র-ছাত্রীরা এই হোমে থেকে পড়াশোনা করে। কারও বাবা মারা গেছে। কারো বাবা বা মা দিনমজুরের কাজ করেন। অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে কোনওক্রমে সংসার চালান। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। তার ওপর পরিবারে তিন চারজনকে নিয়ে সংসার চালিয়ে তাঁদের লেখাপড়া চালানোর মতো সামর্থ থাকে না।

- Advertisement -

ফলে সেই বাবা মারা তার ছেলেদের কাউকে ১০ বছর বা কাউকে ১১ বছর আগে পাঠিয়েছিলেন মালদার কাজিগ্রামে সমাজকল্যাণ দপ্তরের অনুদানপ্রাপ্ত ‘নিরাপদ’ হোমে। হোমটি পরিচালনা করেন “হায়দরপুর শেল্টার অব মালদহ ” নামে একটি সংস্থা। হোমে আবাসিকের সংখ্যা ৫০ জন। তাদের মধ্যে ৮৯.৪ শতাংশ নম্বর পেয়ে তাক লাগিয়েছে এই হোমের আবাসিক চণ্ডী পাহারি। সে পেয়েছে ৪৪৭ নম্বর। তাঁর বাড়ি কোতোয়ালি পঞ্চায়েতের মিহিরদাস কলোনিতে। বাবা মধু দিনমজুর ও মা কাজলী অন্যের বাড়িতে রান্না করেন।

চণ্ডী জানায়, সে ৯ বছর থেকে এই হোমে রয়েছে। সংসারের অনটনের জন্য বাবা-মা পড়াতে পারছিল না। তাই তাঁকে হোমে রাখতে বাধ্য হয়। বাড়িতে আরও দুই ভাই ও এক বোন রয়েছে। তাঁর স্বপ্ন লেখাপড়া করে অধ্যাপক হওয়ার। সে কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে ভর্তি হতে চায়। বাবা মধু বলেন, ‘ছেলে ৮৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাশ করায় আমরা খুব খুশি। ও বাড়িতে থাকলে আমি হয়তো এতদূর পড়াতেই পারতাম না, এতভালো ফলও হত না। আর্থিক অনটনের জন্যই ছেলেকে হোমে রাখতে হয়েছিল। পরিবারের আর্থিক সেই চিত্র এখনও একই আছে। ছেলের কলেজে পড়ার টাকা কোথা থেকে জোগাড় করবো তা ভেবেই কুল পাচ্ছি না এখন।’

আর এক পড়ুয়া গাজলের হবীনগরের প্রবীর হেমব্রম। সে পেয়েছে ৪৪৬ নম্বর, ৮৯.২ শতাংশ। তার বাবা দুলাল হেমব্রম বছরখানেক আগে মারা গিয়েছেন। মা জবা বেসরা দিনমজুরি করেন। পরিবারে আর্থিক অনটনের কারণে ২০১১ সালে তাকে এই হোমে পাঠানো হয়েছিল। বাড়িতে দুই ভাই ও এক বোন রয়েছে। প্রবীরও বড় হয়ে অধ্যাপক হতে চায়। ভূগোলে অনার্স নিয়ে পড়তে চায়। কিন্তু পরিবারের যে আর্থিক অসচ্ছলতা তাতে কলেজে কিভাবে সে ভর্তি হবে তা ভেবেই কূল পাচ্ছে না প্রবীর।

আর এক আবাসিক সমীর সাহার বাড়ি গাজলে হলেও তাঁর মা ও দুই ভাই-বোনকে এখন ইংরেজবাজার শহরের বুড়াবুড়ি তলায় একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। মা অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন। সেই সামান্য অর্থে আর রেশনের চালে কোন রকমে সংসার চলে। জানা গিয়েছে, পারিবারিক আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্যই সমীরকে ২০০৯ সালে হোমে রাখে মা। সমীরের প্রাপ্ত নম্বর ৪৩২, ৮৬.৪ শতাংশ। সে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে পড়ে অধ্যাপক হতে চায়। সমীর বলেন, ‘শত কষ্ট হলেও মা আমাকে পড়াতে চান। কিন্তু আমি তো বুঝতে পারছি যে অন্যের বাড়িতে রান্না করে যে সামান্য টাকা মা পান, তাতে সংসার কোন রকমে চলে। কিন্তু কলেজে পড়ার খরচ জুটবে কিভাবে?’

সংস্থার সম্পাদক মন্ময় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এই তিন আবাসিকের সাফল্যে আমরা খুশি। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও তারা পরীক্ষায় ভালোভাবে সফল হয়েছে। তাদের সাফল্যকে আমরা কুর্নিশ জানাই।’