কোচবিহার থেকে গাঁজা যাচ্ছে, বাংলাদেশে পাচারের স্বর্গরাজ্য হিলি

355

বিধান ঘোষ, হিলি : বাংলাদেশে নেশার সামগ্রী পাচারে স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে হিলির বিস্তীর্ণ এলাকা। শ্রীরামপুর, জামালপুর, শ্রীকৃষ্ণপুর, গোবিন্দপুর, আগ্রা সীমান্তে সক্রিয় হয়েছে পাচারচক্রের পান্ডারা। গত একমাসে এই সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমাণে মাদক দ্রব্য উদ্ধার করেছে বিএসএফ। লকডাউন ও করোনা আবহে পাচারচক্রের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে সব মহল থেকে। বিএসএফের দাবি, চোরাকারবার রোধে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ সহ নামীদামি কোম্পানির মোবাইল ফোন, জিরা, বিট লবণ, প্রসাধনী সামগ্রীর পাচার বেড়েছে হিলির সীমান্ত এলাকাগুলি দিয়ে। পুলিশ ও বিএসএফকে আড়ালে রেখে পাচারকারীরা বাংলাদেশে পাচার চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে ওই মাল পৌঁছে যাওয়ার পর নির্দিষ্ট ঠেকে রাখা হয়। সন্ধে হলে পাচারকারীরা বিএসএফের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে শুরু করে। ফাঁক পেলেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তারা। সেই সব মাল মুহূর্তে বাংলাদেশে পাচার হয়ে যায়। সীমান্তে সারারাত ধরে এমন কার্যকলাপ চালায় পাচারকারীরা। কিছু ক্ষেত্রে বিএসএফ ও পাচারকারীদের গোপন আঁতাতের খবরও এলাকায় চাউর হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় এমন গোপন আঁতাতকে লাইন বলে বলা হয়। আঁতাত বাবদ সংগৃহীত অর্থকে লাইনের টাকা বা চুঙ্গি বলা হয়।

- Advertisement -

কোচবিহার থেকে গাঁজা আসছে হিলির ত্রিমোহিনী, মহিষনোটা এলাকায়। মালদা থেকে গাড়িতে হিলিতে আসছে ইয়াবা ট্যাবলেট ও হেরোইন। নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ আসছে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এসবের ঘাঁটি হয়েছে ত্রিমোহিনী। এখান থেকে হিলির বিভিন্ন এলাকায় দেদার পাচার চলছে। উলটোদিকে, বাংলাদেশ থেকে চারাপোনা মাছ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করছে। পাচারকারীরা প্রত্যেকে এই কাজে ছদ্মনাম ব্যবহার করে। পড়াশোনা বন্ধ থাকায় ও সংসারের হাল ধরতে সীমান্ত এলাকার পড়ুয়া এবং যুবকরাও এই অবৈধ কাজে ঝুঁকে পড়েছে। সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্নও হয়ে পড়ছে অনেকে।

সূত্রের খবর, হিলিতে এই অবৈধ ব্যবসার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা শাসকদলের দুই নেতা। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন মহলের যোগসাজশ রয়েছে। তাঁদের কাছে গিয়ে মাসিক চুক্তি অথবা অবৈধ মালের ওপর লাইন বা চুঙ্গি দিলে ছাড়পত্র মিলে যায়। ওই লাইন বা চুঙ্গি আদায় নিয়ে দলের অন্দরে কর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভও সৃষ্টি হয়েছে। যাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অপ্রকাশিত গোষ্ঠীকোন্দল বেড়ে চলেছে হিলিতে। গত একমাসে হিলি সীমান্ত থেকে বিএসএফ ১৪ হাজার ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৭৮৪ বোতল নিষিদ্ধ কাফ সিরাপ, এক কেজি গাঁজা, একটি মোটরবাইক, একটি টোটো উদ্ধার করেছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কালোবাজারে এসবের মূল্য ৭৩ লক্ষ ১৮ হাজার ১৭৮ টাকা। অন্যদিকে, গত একমাসে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার দুই মহিলা সহ পাঁচ ব্যক্তি আন্তঃজেলা গাঁজা পাচারচক্রে কোচবিহার, শিলিগুড়ি ও ইসলামপুর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় ছয়জনের কাছে থেকে বিপুল পরিমাণে গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে নেমে একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

১৯৯ নম্বর ব্যাটালিয়ন বিএসএফের কম্যান্ডান্ট বলবন্ত সিং নেগি জানান, লকডাউনে সীমান্তে কড়া নজরদারি রয়েছে। চোরাকারবার রোধে বিএসএফ সীমান্তে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে লড়তে সাদা পোশাকের জওয়ান ও গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। পাচার রোধে সীমান্তবাসীর সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখে বিএসএফ। খবর আদানপ্রদানে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, বিএসএফ সীমান্তে পাচারের সময় অনেক মালই উদ্ধার করে। পাচারও রুখে দেয়। কিন্তু পাচারকারীরা সীমান্তে পৌঁছোনোর আগে পুলিশ তাদের আটকাতে পারে না কেন?