সাগিনার স্মৃতি হাতড়াচ্ছে পাহাড়ের কিরকিট গ্রাম

197

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, তিনধারিয়া : ছোটিসি পঞ্ছি ছোট্ট ঠোঁটেরে/ মিষ্টি ফুলের মধু লুটেরে/ ঝিরিঝিরি ঝোরা তিরিতিরি নাচে রে- গানের তালে তালে টয়ট্রেনের লাইনের উপর দিয়ে নেচে নেচে আসছেন দিলীপকুমার, উলটো দিকে নাচছেন সায়রা বানু- এই ছবি আজও বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেয়। তপন সিনহার বিখ্যাত সিনেমা সাগিনা মাহাতোর সেই গানের কথা আজও মুখে মুখে ফেরে দার্জিলিং পাহাড়ে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দিলীপকুমারের যোগাযোগ সাগিনা মাহাতোর হাত ধরেই। সিনেমার বেশিরভাগ শুটিংই হয়েছিল কার্সিয়াংয়ের তিনধারিয়ায়।

যে রেললাইনের উপর নেচেছিলেন দিলীপকুমার সেই লাইন আজও একইরকম আছে। রেলের লোকো শেড, স্টেশন, বাগান পরিবর্তন হয়নি কিছুই। শুধু নেই সাগিনা। বুধবার সকালে তিনধারিয়ার উঁচু পাহাড়ের সীমা ছাড়িয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন মহাশূন্যের পথে। আর সেই খবর পৌঁছাতেই মন খারাপ তিনধারিয়ার। দিনভর দিলীপকুমারের স্মৃতি আউড়েছেন স্থানীয়রা।

- Advertisement -

ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর দেড়টা। কালো মেঘ চিরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। তিনধারিয়া স্টেশনের সামনে জটলা করে বসেছিলেন মিরাজ বিশ্বকর্মা, সুমন ছেত্রীরা। সামনে যেতেই শোনা গেল ছোটিসি পঞ্ছির সুর। ইউটিউব খুলে তখন অন্যদের সাগিনা মাহাতোর ভিডিও দেখাচ্ছিলেন মিরাজ। সেখান থেকেই খোঁজ পাওয়া গেল সুশীলকুমার দীক্ষিতের। কার্সিয়াংয়ের বাসিন্দা পেশায় অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার সুশীলবাবু সামনে থেকে সাগিনা মাহাতোর শুটিং দেখেছিলেন। দেখেছিলেন দিলীপকুমার-সায়রা বানুর নাচ।

কার্সিয়াংয়ের সুশীলবাবু বাড়িতে বসে শোনাচ্ছিলেন শুটিংয়ের নানা গল্প। ১৯৭০ সালে যখন সাগিনার শুটিং হয়েছিল তখন সুশীলবাবুর বাবা বংশীধর দীক্ষিত ছিলেন তিনধারিয়ার ট্র‌্যাক ইঞ্জিনিয়ার। সুশীলবাবু তখন বছর ১৮-র যুবক। বাবার সঙ্গেই শুটিং দেখতে যেতেন। রেললাইনে শুটিংয়ের জন্য পরিচালক তপন সিনহা ট্রলি ব্যবহার করেছিলেন। সেই কারণে সিকিউরিটি মানি জমা দিয়ে রেলের অনুমতি নিতে হয়। অনুমতি নেওয়ার জন্য তাঁর বাবার কাছেই আবেদন করেছিলেন পরিচালক।

তবে গোল বেধেছিল টাকা জমা দেওয়ার সময়। সিকিউরিটি ফি ছিল ২০ টাকা। পরিচালক এবং দিলীপকুমার একসঙ্গেই গিয়েছিলেন অনুমতি নিতে। সেইসময় কারও কাছেই টাকা ছিল না। শেষপর্যন্ত বংশীধরবাবু নিজের পকেট থেকে সেই টাকা দিয়েছিলেন। সেই গল্প বলতে বলতেই পুরোনা দিনগুলোতে যেন ডুবে গেলেন সুশীলবাবু। বললেন, প্রায় প্রতিদিনই শুটিং দেখতে যেতাম। অন্যদের ক্ষেত্রে বারবার রিটেক করাতে হলেও দিলীপকুমার এক টেকেই কাজ শেষ করতেন।

শুটিংয়ের জন্য তিনধারিয়া লোকোশেডের নীচে কিরকিট গ্রামকে সাজিয়েছিলেন তপন সিনহা। সাগিনা মাহাতোর স্মৃতিতে আজও সেই গ্রামে তৈরি হয়নি কংক্রিটের কোনও বহুতল। যেভাবে শুটিংয়ের সময় সাজানো হয়েছিল গ্রামের বাড়িগুলি এখনও তেমনই আছে। ছোটিসি পঞ্ছি গানে দিলীপ-সায়রা বানুর নাচের দৃশ্যে পিছন থেকে ছুটে আসছিল একটি টয়ট্রেন। সেই ট্রেন যিনি চালিয়েছিলেন সেই নরবীর গজমের অসুস্থ হয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি। তাঁর ছেলে যাদব গজমের বলেন, শুটিংয়ের সময় আমরা ছোট ছিলাম। বাড়ি থেকে দৌড়ে চলে যেতাম। সেইসব স্মৃতি ভোলার নয়।

সাগিনায় লোকোশেডের ভেতরে একটি মারামারির দৃশ্যে শুটিং দলকে সহযোগিতা করেছিলেন তিনধারিয়ার লোকবাহাদুর ছেত্রী। বছর পঁচাশির লোকবাহাদুর এখন ঠিকমতো সবটা মনে করতে পারেন না। তবে দিলীপকুমারের কথা ভোলেননি। শুটিংয়ে সময় লোকোশেডের সামনে থাকা একটি লোহার স্তম্ভে দিলীপকুমারের ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার কথা গড়গড় করে বললেন তিনি।

দিলীপকুমারের গ্রাম থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। কয়েকদিন আগে জাতীয় সড়ক ধসে যাওয়ায় শিলিগুড়ি ফিরতে কিরকিট গ্রামের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি ঘুরপথে নামার সময় সাগিনার কথাই ভাবছিলাম। গ্রামের উপর দিয়ে চলে যাওয়া বিদ্যুতের তারে তখন নাম না জানা দুটি পাখি টানা শিস দিয়ে যাচ্ছিল। আরও একবার মনে পড়ল ছোটিসি পঞ্ছির কথা। দিলীপকুমারকে যেন শেষশ্রদ্ধা জানাচ্ছে তিনধারিয়া।