গঙ্গার ঘাটে এবার ইলিশ মেলার সম্ভাবনা

473

কলকাতা : একের পর এক দুর্যোগে বিধ্বস্ত বাংলা। এর মধ্যে সুখবর হল, এ বছর আবার ফিরতে পারে ইলিশের স্বাদ। দীর্ঘ লকডাউনে কলকারখানা বন্ধ থাকায় গঙ্গা আগের চেয়ে এখন অনেক পরিষ্কার। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গঙ্গার জলে দ্রবীভত অক্সিজেনের মাত্রা বেড়েছে। এতে উৎসাহিত মৎস্যবিজ্ঞানী ও মৎস্যচাষিরা। হুগলির বলাগড় বা উত্তরপাড়ার ঘাটে দীর্ঘদিন আর ইলিশের দেখা মেলে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, গঙ্গার জল এখন এতটাই পরিষ্কার যে, মিঠে জলে ডিম পাড়তে এ বছর ইলিশের ঝাঁক অনেক ভিতর পর্যন্ত চলে আসতে পারবে।

সাধারণত জুন মাস থেকেই ডিম পাড়ার জন্য মোহনা থেকে নদী বরাবর উজানে মিষ্টি জলে ঢুকতে শুরু করে এই রুপোলি ফসলের ঝাঁক। কিন্তু এতদিন দূষণের মাত্রা মোহনা থেকেই এত বেশি থাকত যে, শ্বাস নিতে না পেরে ইলিশের ঝাঁক আর নদীর মিঠে জলে ঢুকতেই পারত না। ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর পুবালি হাওয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মত, এটাই ইলিশের ঝাঁক ঢোকার পক্ষে আদর্শ পরিবেশ। তাঁদের মতে, বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি এবার গঙ্গার ঘাটগুলিতেও ইলিশ মেলার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। এ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের তটবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার মৎস্যজীবী গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। তাঁরা টানা ৫-৭ দিন সমুদ্রে মাছ ধরার পর ট্রলার বোঝাই করে তীরে ফেরেন। সেই মাছের সিংহভাগ বিক্রি হয় দিঘা মোহনা ফিশ মার্কেটে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন মাছ এই বাজার থেকে বিক্রি হয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই বিদেশে রপ্তানি হয। এবার অবশ্য এই বাজার নিযে তীব্র আপত্তি জানাচ্ছেন স্থানীয বাসিন্দারা। বাজার শুরু হলে এ রাজ্য ও ওডিশার বেশ কয়েক হাজার মৎস্যজীবী প্রতিদিন মাছ নিযে আসবেন। স্থানীয বাসিন্দারা করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন। দিঘা মৎস্যজীবী ও মৎস্য ব্যবসাযী  সমিতির সম্পাদক প্রণব কর বলেন, ‘শনিবার গ্রামবাসীদের সঙ্গে বৈঠক হবে। তাঁদের বুঝিয়ে বলা হবে সমস্তরকম স্বাস্থ্যবিধি মেনেই বাজার চালানো হবে।’ তবে গ্রামবাসীরা না বুঝলে মৎস্যজীবীরা বড় সমস্যায় পড়বেন। বাজার চালু না হলে ১৫ জুন থেকে মাছ ধরতে যাওয়া অনিশ্চিত হযে যাবে। ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওযা নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু এ বছর লকডাউনের কারণে চাহিদা কমে আসায় মার্চের মাঝামাঝি থেকেই সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিলেন মৎস্যজীবীরা। সমুদ্রের পাশাপাশি নদীতে মৎস্যজীবীরা ছোট ডিঙি নিযে মাছ ধরেন। কিন্তু বহু বছর রূপনারাযণ ও গঙ্গায ইলিশ ঢোকে না বললেই চলে।

- Advertisement -

একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁর মালিক অঞ্জন চট্টোপাধ্যায বলেন, ‘ছোটবেলায উত্তরপাড়ার খেযাঘাট থেকে আনা গঙ্গার ইলিশের স্বাদ এখনও মনে আছে। ইলিশের মান ভালো হলে খাবারের স্বাদই বদলে যায়।’ উত্তর কলকাতার এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা আগে বাগবাজার আর উত্তরপাড়ার ঘাটে জেলেদের মাছ ধরতে দেখতাম। ওই ইলিশ বাজারে আসার আগেই ঘাট থেকে উধাও হযে যেত।’ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায স্মৃতির ঝুলি হাতড়ে বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় যখন কলকাতায আসতাম, বাবা গঙ্গার ইলিশ কিনতেন। তখন দ্বিতীয বিশ্বযুদ্ধের সময। কলকাতার নানা ঘাটে জেলেরা তাঁদের ধরে আনা ইলিশ বিক্রি করতেন। আমাদের কাছে ইলিশ একটা আবেগ।’

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ইলিশ মাছ মূলত এই সমযে ডিম পাড়ার জন্যই সমুদ্র থেকে নদীর উজানে আসে। একটি পূর্ণবযস্ক ইলিশ ১০ থেকে ১২ লক্ষ ডিম পাড়ে। এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক ডিম থেকেই বাচ্চা বের হয। এখন আমাদের দেশে সাড়ে ৩০০ গ্রামের ইলিশকেই ডিম পাড়ার উপযোগী পূর্ণবযস্ক মাছ ধরা হয়।

সিধু কানু বিরসা বিশ্ববিদ্যালযে পরিযায়ী মাছেদের নিযে গবেষণা করছেন অসীমকুমার নাগ।  তিনি বলেন, ‘এ বছর হুগলি নদীর জল এতই পরিষ্কার যে ইলিশের পক্ষে শ্বাস নিতে কোনও কষ্ট হবে না। এবার বড় বড় ইলিশও উজানে ডিম পাড়তে আসবে। পুরোনো দিনের মতো আবারও গঙ্গার ঘাটগুলিতে ইলিশের দেখা মিলবে।’ কাকদ্বীপ ফিশারমেন ওযেফেযার অ্যাসোসিযেনের বিজন মাইতির বক্তব্য, ‘এ বছর বর্ষা সময়ে ঢুকেছে। পুবালি হাওয়াও বেশ শক্তিশালী। গত বছর ১৪ হাজার টন ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। এ বছর ২২ থেকে ২৪ হাজার টন ইলিশ উঠবে বলে আমাদের আশা।’

তথ্য- পুলকেশ ঘোষ