শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : বয়সের ভারে আর সোজা হয়ে চলতে পারেন না। কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজতেই চক হাতে তিনি ক্লাসরুমে ঢুকে পড়েন। স্থানীয় একটি ক্লাবে চলা স্কুলের ক্লাসরুমে আওয়াজ ভেসে আসে, গুড মর্নিং ম্যাডাম। পড়ুয়ারা কেউ চল্লিশ, আবার কারও বয়স দশ বছর। গত ৪৫ বছর ধরে এভাবেই এলাকায় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত বিভিন্ন বয়সের পড়ুয়াদের অক্ষরপরিচয় করাচ্ছেন শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রকাশনগরের বাসিন্দা হিরাদেবী গুরুং।

একার সংসারে প্রবল অর্থকষ্ট। তার থেকেও একাকিত্বের বড়ো যন্ত্রণা রয়েছে। হিরাদেবী গুরুংয়ের আদি বাড়ি মিরিকে। ৫৫ বছর আগে বিয়ে হওয়ার পর তিনি প্রথম এই এলাকায় আসেন। কিন্তু হিরাদেবীর বৈবাহিক জীবন বেশিদিন টেকেনি। বিয়ের কিছুদিন পরেই স্বামী তাঁকে ছেড়ে যান। এলাকার একটি ঝুপড়ি বাড়িতে ভাড়া থাকতে শুরু করেন তিনি। সেই সময় দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া হিরাদেবীর চাকরি পেতে অবশ্য দেরি হয়নি। শহরের একটি নার্সিংহোমে নার্স হিসেবে কাজ শুরু করেন।

- Advertisement -

পুরনিগমের এই এলাকায় অনেকটা জায়গাজুড়ে বস্তি। নিম্নবিত্ত মানুষের বাস। কাজে যাওয়া-আসার পথে এলাকার শিশু-কিশোরদের স্কুলে না গিয়ে ঘুরতে দেখে তাঁর মনে একটা ভাবনা জেগে আসে। অবশেষে ৪৫ বছর আগে ভাড়াঘরে প্রথম ১০ জন শিশুকে ডেকে শিক্ষার পাঠ দিতে শুরু করেন। এই এলাকার মানুষের কথা মাথায় রেখে হিন্দি, বাংলা ও ইংরেজি তিন ভাষাতেই তিনি পড়াতেন। শুধু শিশু-কিশোররাই নয়, তাঁর পড়ানোর টানে বয়সের বাধা ভেঙে আসতে থাকেন বয়স্করাও। আর সেই ট্র‌্যাডিশন এখনও চলছে। একসময় গাছতলা, এলাকার একটি খালি জমিতে মাদুর পেতে পাঠশালা চলত। খালি জায়গায় নির্মাণকাজ শুরু হলে স্থানীয় রয়্যাল ইয়ুথ ক্লাবের সদস্যরা হিরাদেবীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এরমধ্যে নিজের সংসার চালানোর কথা না ভেবে নার্সের কাজ ছেড়ে এলাকায় পুরোপুরি দিদিমণি হয়ে গিয়েছন হিরাদেবী। পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলির ছেলেমেয়েরা তাঁর হাত ধরে অক্ষর চিনে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, তাদের অনেকে স্কুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও অনেকটা পথ পেরিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছে।

হিরাদেবীর কাছ থেকেই হাতেখড়ি হয়েছে বর্তমানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বিকি প্রসাদ, মালবাজারের এক বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা ললিতা গুপ্তার। তাঁদের কথায়, হিরা ম্যাডাম আমাদের বই না চেনালে আমরা কোনোদিনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতাম না। শুধু বিকি নন, বছর ষাটের মালতী তামাং, রিনা রায়দের ছোটোবেলায় পড়াশোনা না শেখার কষ্টও ভুলিয়ে দিয়েছেন হিরাদেবী। তাঁদের কথায়, ছোটোবেলায আর্থিক কষ্টের জেরে পড়াশোনা করতে পারিনি। এখন ম্যাডামের জন্য পড়তে পারি। কেউ কোথাও সই করতে বললে এখন কী লেখা আছে পড়ে নিতে পারি। এসব শুনে মুখে হাসি ফুটল হিরাদেবীর। বয়স ৮০ পেরিয়েছে। এখনও নিজের কাজ করেন সমান যত্ন আর উদ্যম নিয়ে। তিনি বলেন, বাবা বলত পড়াশোনা শেখানো মহৎ ব্যাপার। তাই আমি যতটা পড়াশোনা শিখেছি তা দিয়ে এলাকায় শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে পড়া সবাইকে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করি। এখানকার লোকজন ভালোবেসে কখনও চাল, ডাল দেয়। তা দিয়ে আমার চলে যাচ্ছে।

এলাকার বাসিন্দা সুরজ ছেত্রী বলেন, উনি আমাদের জন্য বিনা পয়সায় এলাকার পিছিয়ে পড়া ছেলে, মেয়ে থেকে শুরু করে বয়স্কদের পড়ান। কিন্তু আমরা ওঁর জন্য কিছুই করতে পারি না। মাঝেমধ্যে আমরা চাল, ডাল, ঝুপড়ির ভাড়া তুলে দিলেও, তা যথেষ্ট নয়। অনেকসময়ে তিনি না খেয়ে আমাদের পড়াতে চলে আসেন। ওয়ার্ড কাউন্সিলার তথা পুরনিগমের চেয়ারম্যান দিলীপ সিং বলেন, হিরাদেবীকে বহুদিন ধরে দেখছি। উনি নিঃশব্দে যেভাবে সমাজের কাজ করে চলেছেন তা ভাবা যায় না। পুরনিগমের তরফে ওঁর আর্থিক কষ্ট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ওঁর শিক্ষা প্রসারের এই কর্মযজ্ঞে কোনো দরকার হলে আমি তার জন্য সবসময় প্রস্তুত।