শুভজিৎ দত্ত মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, নাগরাকাটা রাঙ্গালিবাজনা : রাজ্য সরকার চা পর্যটন নিয়ে নতুন করে এগোতে চাইছে। বিরোধী শ্রমিক সংগঠনগুলি জমির পরিমাণের প্রশ্ন তুলে ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে সরব হয়েছে। শ্রমিকদের বসবাসের পাট্টা না দিয়ে মালিকদের হাতে পর্যটনের নামে জমি দিয়ে আদৌ লাভ হবে না বলে দার্জিলিংয়ে সাংসদ রাজু বিস্ট জানিয়েছেন। আলিপুরদুয়ারের সাংসদ জন বারলাও রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত নয়া আঙ্গিকের চা পর্যটন নিয়ে বন্ধ, রুগ্ণ ও কোনোক্রমে ধুঁকতে থাকা বাগানগুলির শ্রমিক ও বাসিন্দাদের একটি বড়ো অংশই অবশ্য আশার আলো দেখছেন। আরেক মহলের অবশ্য দাবি, বাগানগুলিতে চা পর্যটন চালু হলেও তাতে চা শ্রমিকদের আখেরে কোনো লাভ হবে না।

উত্তরবঙ্গে বহু বন্ধ বা রুগ্ণ বাগানে চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর‌্য রয়েছে। যেমন বীরপাড়া-মাদারিহাট ব্লকের বান্দাপানি। ভুটান লাগোয়া ওই বাগানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে চা পর্যটনের কাজে লাগানোর দাবি জোরালো হচ্ছে। বান্দাপানি টি অ্যান্ড অ্যালায়েড প্ল্যান্টেশন ওয়ার্কার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান অশোক টোপ্পো বলেন, বাগানের ফ্যাক্টরি কোনো দিন সচল হবে কিনা ঈশ্বর জানেন। এই পরিস্থিতিতে এখানকার সমবায়, স্বনির্ভরগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে ইকো-টুরিজম কিংবা হোমস্টে ধাঁচের পর্যটন ব্যবস্থা চালু করা যেতেই পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য একান্তভাবে প্রয়োজন।

- Advertisement -

কালচিনি ব্লকের মেচপাড়া চা বাগানে ৪৫ জন বেকার যুবক-যুবতি তিন বছর ধরে কালচিনি-ডুয়ার্স মাল্টিপারপাস কোঅপারেটিভ সোসাইটি নামে একটি সমবায় গড়ে সম্পূর্ণ নিজেদের পুঁজি খাটিয়ে ছোটোখাটো ব্যবসা করছেন। তাঁরা বাগানের পাক্ষিক মজুরির দিন মুদিখানার সামগ্রী সহ স্টেশনারি দ্রব্য বিক্রি করেন। সমবায়টির সম্পাদক সঞ্জয় লোহারের কথায়, এখনও কোনো মহল থেকেই কোনো সাহায্য জোটেনি। সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হলে আসানেদ সুবিধা হবে। বাগানে পর্যটনের দায়িত্বে যদি আমাদের মতো সংস্থাগুলিকে নিয়ে আসা হয় তবে নিশ্চিতভাবে রোজগারের রাস্তা খুলে যাবে।

ডানকানসের বাগানগুলির পরিস্থিতি যে তথৈবচ তা সবারই জানা। ওই গোষ্ঠী সরাসরি এখনও যেকটি বাগানের দায়িত্বে রয়েছে সেগুলির প্রতিটিই পর্যটন সম্ভাবনায় ভরপুর বলে শ্রমিকরা জানাচ্ছেন। মেটেলির কিলকোট বাগানের প্রকাশ নায়েক নামে এক শ্রমিক নেতার কথায়, সরকার চা বাগানে পর্যটন নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সঙ্গে আমরা একমত। তবে বন্ধ বা আমাদের মতো রুগ্ণ বাগানগুলিতে যদি শ্রমিকদের ব্লু হোমস্টে টুরিজম খুলতে সাহায্য করা হয় তবে সমষ্টিগতভাবে অনেকেই উপকৃত হবেন।

সরকারি সাহায্য ও সামান্য প্রশিক্ষণ পেলে তাঁরা সহজেই হোমস্টে চালাতে পারবেন বলে এই বাগানের কপিনা গোয়ালা, রত্না ওরাওঁয়ের মতো স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা জানান। নাগরাকাটার রুগ্ণ বাগান ক্যারনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। বাগানের শ্রমিক রাম বরাইকের কথায়, মালিকের হাতে নয়, সরকার যদি সবরকম সাহায্য দিয়ে বাগানের শ্রমিকদের হাতেই পর্যটনের ব্যবস্থা তুলে দেয় তবে স্থানীয় অনেকেই উপকৃত হবেন।

বন্ধ রেডব্যাংক চা বাগানে শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে টি টু্রিজমকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে বলে বন দপ্তরের অনারারি ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন সীমা চৌধুরি মনে করেন। তাঁর কথায়, বাগানটিতে নদী-পাহাড়, জঙ্গল রয়েছে। যাতে স্থানীয় শ্রমিকদের চা পর্যটন ব্যবস্থায় শামিল করা যায় সেজন্য উপরমহলকে প্রস্তাব দিতে ইতিমধ্যেই ধূপগুড়ির বিডিওকে অনুরোধ করেছি।

অন্যদিকে, বন্ধ ও রুগ্ণ বাগানে টি টুরিজম চালু নিয়ে আশঙ্কার বিষয়টিও উঠে আসছে। বীরপাড়া চা বাগানের কর্মী রবিনসন কুজুর বলেন, বাগানে টি টুরিজমের ব্যবস্থা হতেই পারে। কিন্তু তাতে শ্রমিক-কর্মচারীদের কোনো লাভ হবে না। তার চেয়ে সরকার চা বাগানের শ্রমিক-কর্মচারীদের পাট্টা দেওয়ার ব্যবস্থা করুক। ডুয়ার্স চা বাগান ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি গোপাল প্রধান বলেন, চা পর্যটনকে কেন্দ্র করে কলকাতার পর্যটন ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের কোনো লাভ হবে না। চা বাগানের শ্রমিক-কর্মচারীদের উপকার করতে গেলে চা বাগানগুলি যাতে ভালোভাবে চলে সেই ব্যবস্থাই করতে হবে।

চা বাগান তৃণমূল কংগ্রেস মজদুর ইউনিয়নের সহসভাপতি মান্নালাল জৈন অবশ্য বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থে প্রথমেই বন্ধ, অচল চা বাগানগুলি খোলা দরকার। রাজ্য সরকার এজন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। চা বাগান খোলা থাকলে এবং একই সঙ্গে টি টুরিজমের ব্যবস্থা হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা অবশ্যই লাভবান হবেন।