আশার আলো দেখাচ্ছে রেমডেসিভির

410

ডাঃ অরূপরতন হালদার: কোভিড ক্রান্তিলগ্নে যখন মানুষ করোনার প্রাণভোমরাটিকে কোন জাদুবস্তু নিকেশ করবে সেদিকে আকুল নয়নে তাকিয়ে তখনই দিগন্তে উঁকি দিল আশার সূর্য। এর আলোয় অন্ধকার কেটে যাবে, সেই ভরসায় বুক বাঁধছে মানুষ।

হ্যাঁ, রেমডেসিভির-এর কথাই বলছি। কী এই রেমডিসিভির?
রেমডেসিভির হল একটি ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ, যা আমেরিকার গিলিয়াড সায়েন্সেস নামে ওষুধ নির্মাতা গবেষণার পর আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। এই মুহূর্তে এই বিশেষ যৌগটির উপর সারা পৃথিবীর দৃষ্টি নিবদ্ধ। কারণ, বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, এই ওষুধটি করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে সক্ষম।

- Advertisement -

এটা একটা নিউক্লিওটাইড অ্যানালগ, মূলত অ্যাডেনোসিন অ্যানালগ যা ভাইরাসের আরএনএ শৃঙ্খলের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরি হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এর আগে পরীক্ষায় সারস করোনা ভাইরাস ও মারণ করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই ওষুধের কার্যকারিতা লক্ষ করা গিয়েছে। ইবোলা এবং মারবার্গ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইযে জন্য গবেষণায় এই ওষুধটি বিজ্ঞানী থমাস চিলারের তত্ত্বাবধানে উদ্ভাবিত হয়।

এই মুহূর্তে আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ (এনআইএআইডি)-এর তত্ত্বাবধানে ১০৬৩ জনের উপর এই ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এখন তৃতীয় পর্যায়ে দুটো ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। ওষুধের ব্যাপারে আমেরিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ এই পরীক্ষাকে ছাড়পত্র দিয়েছে। মার্চ মাস থেকে ব়্যানডোমাইজড, ওপেন-লেভেল, মাল্টিসেন্ট্রিক স্টাডি শুরু হয়ে গিয়েছে। একটি পরীক্ষা হবে সেই সব রোগীর উপর যাঁদের দেহে অধিক মাত্রায় কোভিড সংক্রমণ দেখা গিয়েছে। দ্বিতীয় পরীক্ষাটি হবে সেই সব রোগীকে নিয়ে যাঁদের দেহে মাঝারি ধরনের সংক্রমণ দেখা গিয়েছে। দুক্ষেত্রেই ৫ দিন এবং ১০ দিনের সময়কালে রোগীর শরীরে এই ওষুধ কতটা কার্যকর ও নিরাপদ সেই পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

চিনের স্বাস্থ্যমন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে আরও দুটি ক্লিনিকাল ট্রাযাল চালু হয়েছে। হুবেই প্রদেশে চিন-জাপান ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালে ওই পরীক্ষাতেও রোগীদের উপর রেমডেসিভির-এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার দিক খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। এই পরীক্ষার জন্য গিলিয়াড সংস্থা বিনামূল্যে ওষুধ ও পরীক্ষার যাবতীয় পরিকাঠামো ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।

ফ্রান্সের আইএনএসইআরএম সংস্থাও হুর নির্দেশিত প্রোটোকল অনুযাযী রেমডেসিভির-এর উপর পরীক্ষা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রেও ওষুধের সরবরাহ ও পরীক্ষার প্রযুক্তিগত দিকে পূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে গিলিয়াড।

এনআইএআইডি-র প্রধান ডাঃ অ্যান্থনি ফৌসি বলেছেন, তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেরে উঠতে যে সময় লাগছে তা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রেমডেসিভির-এর পরিষ্কার, ইতিবাচক ও তাত্পর্যপূর্ণ প্রভাব দেখা গিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, পরীক্ষার ফলাফল দেখে এই সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে যে, এই ওষুধ ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম এবং সেইসঙ্গে রোগীদের চিকিত্সার ক্ষেত্রে এই ওষুধ নতুন এক দরজা খুলে দিতে পারে। যুক্তরাজ্যের ভাইরাস-বিশেষজ্ঞ স্টিফেন গ্রিফিন বলেছেন, রেমডেসিভির-এর উপর এখন আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ। কারণ, এখনও পর্যন্ত এটিই এই রোগের বিরুদ্ধে আমাদের হাতে আসা প্রধান অস্ত্র।

মৃত্যুহারের উপর এর প্রভাব এখনও পুরোপুরি বুঝে ওঠা যায়নি। তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যাঁদের রেমডেসিভির দেওয়া হয়েছিল তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৮ শতাংশ আর যাঁদের রেমডেসিভির না দিয়ে শুধু প্লাসেবো দেওয়া হয়েছিল তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১১.৬ শতাংশ।

নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি তথ্যে দেখা গিয়েছে, ২৫ জানুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত একটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালে আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা ও জাপানের ৫৩ জন রোগীর উপর রেমডিসিভির প্রয়োগ করা হয়েছিল। তাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩৬ জন (৬৮ শতাংশ) রোগীর ক্ষেত্রে বাকিদের তুলনায় অধিক অগ্রগতি লক্ষ করা গিয়েছিল।

আমেরিকায় যে পরীক্ষা চলছে তাতে প্রাথমিকভাবে দেখা গিয়েছে, যে ৫০ শতাংশ রোগীকে ৫ দিনের জন্য রেমডেসিভির দেওয়া হয়েছিল তাঁদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং এঁদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি দুসপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যাঁদের দেহে রেমডেসিভির প্রয়োগ করা হয়েছিল তাঁরা ৩১ শতাংশ কম সময়ে সেরে উঠেছেন। যাঁদের রেমডেসিভির দেওয়া হয়েছিল তাঁদের গড়ে ১১ দিন এবং যাঁদের রেমডেসিভির দেওয়া হয়নি তাঁদের ক্ষেত্রে এই রোগ থেকে সেরে উঠতে গড়ে ১৫ দিন সময় লেগেছে।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন-এর ক্লিনিকাল প্রফেসার অফ মেডিসিন এবং ইমিউনোকম্প্রোমাইজড হোস্ট ইনফেকশাস ডিজিজ-এর প্রধান ডঃ অরুণা সুব্রহ্মনিযান এই পরীক্ষার অন্যতম প্রধান পরীক্ষক। তিনি জানিয়েছেন, যে সব রোগীকে ১০ দিনের জন্য ওষুধ দিযে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের ফলাফল দেখা গিয়েছে। গিলিয়াড জানিয়েছে, এই পরীক্ষার প্রাথমিকভাবে যেখানে শেষ হওয়ার কথা ছিল সেই পর্যন্ত এগোনো গিয়েছে। এরপরে বাকি তথ্য এনআইএআইডি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর জানাবে।

ডাঃ অ্যান্থনি ফৌসি জানিয়েছেন, রোগীদের ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ উন্নতির যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তা ১০০ শতাংশ উন্নতির মতো বাজিমাত করে দেওয়া কোনও ব্যাপার না হলেও ওষুধটির কাজ করার ধারণার ক্ষেত্রে এক আশাব্যঞ্জক খবর। ডঃ সুব্রহ্মনিয়ানের মতে, এত দ্রুত বেড়ে চলা এক মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোনও সমাধান সূত্র পাওয়ার জন্য গবেষকরা মরিয়া লড়াই চালাচ্ছেন। এই লড়াইয়ে রেমডেসিভির অবশ্যই সর্বোচ্চ মনোযাগের কেন্দ্রে রয়েছে।

এই মুহূর্তে এফডিএ ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা গিলিয়াড-এর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে যাতে দ্রুত এই ট্রায়াল শেষ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় এবং দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে এই ওষুধ তৈরি করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র: ১. দ্য ল্যানসেট। ২. নেচার। ৩. বিবিসি নিউজ। ৪. ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেস। ৫. গিলিয়াড। ৬. দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন।