করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন বাচ্চাদের

134

ডঃ শমীক বসু
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

নতুন বছর। নতুন কোভিডের মারণ কামড়। এবার অন্য রূপে, দ্বিগুণ শক্তিতে আক্রমণ করছে। আমরা এবার অনেকটাই তাকে সাহায্য করেছি। বেরোনো, ভোটের প্রচার, সব নিয়ম ভুলে গিয়ে কোভিড নিয়ে খেলায় মেতেছি। কিন্তু এবার খেলা ভয়ংকর। সংক্রমণ প্রায় দ্বিগুণের বেশি।প্রচণ্ড গতিতে ছুটছে কোভিড। তার টিমে এখন অনেক রকম স্ট্রেন। ইউকে, সাউথ আফ্রিকা, ব্রাজিল এবং ডাবল মিউট্যান্ট ইন্ডিয়ান স্ট্রেন। আন্তর্জাতিক টিম নিয়ে মাঠে নেমেছে কোভিড। ড্রিম টিম প্রায়।

- Advertisement -

এবার চিন্তায় ফেলেছে দুটি ব্যাপার। কমবয়সি এবং শিশুরা বেশি সংক্রামিত হচ্ছে। কেন? কেননা এরা আগেরবার বেঁচে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও আমরা নিয়ম মানিনি। বিশ্বাস করিনি যে, আমাদের আবার করোনা হতে পারে। নিজেদের সাফল্যের উল্লাসে ভুলেই গিয়েছি, মাস্ক পরতে এবং দূরত্ব বজায় রাখতে।

বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে গিয়েছি। কোথাও কোথাও স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর টিউশন, গান শেখা, ক্রিকেট প্র‌্যাকটিস, নাচ শেখা পুরোদমে শুরু হয়েছে। অটো-বাস-ট্রেনে চেপে যাচ্ছে বাচ্চারা। ব্যাস, এবার সারা পরিবারের একসঙ্গে হচ্ছে। বাচ্চাদের মারাত্মক কিছু হচ্ছে না, কিন্তু তারা সংক্রমণ ছড়াচ্ছে অনেক বেশি। সবচেয়ে বিপদ, বয়স্ক দাদু-দিদিমাদের। কিন্তু যাঁরা দুটো ভ্যাকসিন নিয়ে নিচ্ছেন, তাঁরা অনেকে বেঁচে যাচ্ছেন। বাচ্চারা মাস্ক পরতে চায় না, নিয়ম মানতে পারে না-বড় বাচ্চারা ছাড়া পেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করছে, আগের বারের মতো বেঁচে যাব বা আমাদের করোনা হবে না মনোভাব হয়ে যাওয়ায় তাঁরা অনেকটাই অসাবধান হয়ে গিয়েছেন এবং তাতেই ঘনিয়ে এসেছে বিপদ।

তাহলে উপায়? কী হবে? চারদিকে এত আতঙ্ক!

সাবধানের মার নেই। তাই আবার সাবধান হতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোনো যাবে না। এন৯৫ বা ডাবল সার্জিক্যাল মাস্ক ছাড়া বেরোনো যাবে না। জনবহুল জায়গায় যাওয়া যাবে না। সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।উপসর্গগুলো একটু বদলে গিয়েছে। ভাইরাস চালাক হয়ে রূপ বদলেছে। প্রথম ঢেউতে হত জ্বর, কাশি আর নিঃশ্বাসে কষ্ট। এবার জ্বর নাও হতে পারে। এবার বেশিরভাগ দেখা যাচ্ছে, গা ব্যথা, দুর্বলতা, ডায়ারিয়া, গলাব্যথা, র‌্যাশ বা কনজাংটিভাইটিস, তারপর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট। আগে ৮ থেকে ১০ দিনের মাথায় জটিলতা দেখা দিত। কিন্তু এবার অনেক সময় ৫ দিনের থেকেই জটিলতা শুরু হয়ে যাচ্ছে। অনেক আগে এবং অনেক বেশি হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে।

বাচ্চারা সংক্রামিত হচ্ছে অনেক বেশি। কিন্তু এখনও ভালো খবর হচ্ছে যে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে অনেক কম। রোগ প্রতিরোধে অক্ষম বাচ্চাদের জটিলতা হচ্ছে অনেক বেশি। তাদের ভর্তি হতে হচ্ছে আগেরবারের মতোই। তাহলে এর চিকিৎসা কী? হোম আইসোলেশন ১৪ দিনের জন্য। প্রথম উপসর্গ থেকে যদি ১০ দিন কেটে যায়, তাহলে বিপদ অনেকটাই কেটে যাবে। এইসব বাচ্চার কোনও ওষুধের দরকার নেই, ওষুধও নেই। খাওয়াদাওয়া সব স্বাভাবিক থাকবে। পারলে সবসময় বাড়িতে মাস্ক পরে থাকবে। অন্যদের থেকে দূরে থাকবে। কেউ কেউ চাইলে ভিটামিন খেতে পারে। যদিও ভিটামিন খেলে কোভিড চলে যাবে বা কমে যাবে না।

সদ্যোজাত বাচ্চাদেরও এক নিয়ম। মা মাস্ক পরে নিজের দুধ খাওয়াবে, যে কোনও একজন বা দুজনের কোভিড হলেও। কিশোর-কিশোরীদের কিছুটা বড়দের মতো চিকিৎসা করা যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন, বাড়িতে যাদের থাকতে বলা হয়েছে, তাদের খুব একটা কিছু ওষুধ দেওয়ার নেই। কিছু খারাপ বাচ্চাদের ভর্তি হতে হলে তাদের অক্সিজেন, স্টেরয়েড ও রেমডেসিভির লাগতেও পারে। তবে মৃত্যু প্রায় নেই বললেই চলে।

টিকা আসছে, আসবে। এই মুহূর্তে বাচ্চাদের জন্য টিকা নেই আমাদের দেশে। ইজরায়ে এবং ইউকে-তে ট্রায়াল হয়েছে। বিলেতে খুব তাড়াতাড়ি ১২ বছরের ঊর্ধ্বে ছেলেমেয়েদের টিকা দেওয়া হবে। ৬ মাসের ঊর্ধ্বে বাচ্চাদেরও ট্রায়াল শুরু হচ্ছে। আমাদের দেশেও কোভ্যাকসিন বাচ্চাদের ওপর ট্রায়াল শুরু করবে। কিন্তু আপাতত আমাদের দেশের বাচ্চাদের টিকার আশা কম। খুব তাড়াতাড়ি হলেও এই বছরের শেষে বা পরের বছরে পাওয়া যেতে পারে।

পরিশেষে একটা সতর্কবার্তা দেব, ২ শতাংশ বাচ্চাদের যাদের এবার কোভিড হল, তাদের মাসদুয়েক পরে পিআইএমএস বা কাওয়াসাকির মতো অসুখ হতে পারে। এই জাতীয় রোগ বেশ জটিল এবং প্রতি ক্ষেত্রেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেইসঙ্গে দামি ওষুধের সাহায্য লাগতে পারে। আতঙ্কিত হবেন না। কার হবে বা কার হবে না, সেটা আগে থেকে বলা যাবে না। তাই ভাববেন না, কোভিড হয়ে যাওয়াই ভালো, যদি আমার বাচ্চার কোভিডে কিছু না হয়।

সমুদ্রের তীরে যেমন প্রবল বেগে ঢেউ আছড়ে পড়ে, তেমনই যে ভালো সাঁতারু, সে কিন্তু সাবধানতা বজায় রেখে নিয়ম মেনে এই ঢেউকে ঠিকই জয় করে। আমরাও চাইলে সেটা পারব। শুধু চাই সাবধানতা আর অনুশাসন। ক্ষণিকের আনন্দের লোভে পড়ে প্রিয়জনকে বিপদে ফেলবেন না। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, আপনার ডাক্তারের সাহায্য নিন।