তপনকুমার বিশ্বাস, ইসলামপুর : বাংলাদেশ থেকে ইসলামপুর মহকুমার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে চোরাপথে এদেশে আসতে বা ওপারে পৌঁছে দিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে  সিন্ডিকেট। দুদেশের সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে আছে ওই সিন্ডিকেটগুলির জাল। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, চোরাপথে দুদেশের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে এই সিন্ডিকেটগুলি দীর্ঘদিন থেকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদেশে যারা আসছে তাদের মধ্যে রয়েছে অনেক মহিলাও, যাদের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে এদেশে এনে পাচার করা হয় মুম্বই-দিল্লি সহ দেশের বড়ো বড়ো শহরের নিষিদ্ধপল্লিতে। ইসলামপুর মহকুমার সীমান্ত এলাকা থেকে বিএসএফ ও পুলিশ প্রায় রোজই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আটক করছে। কিন্তু ধরপাকড়ের পরেও চোরাপথে পারাপার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

সীমান্তে পারাপারের সিন্ডিকেটের মাথারা শাসকদলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রং বদল করে নিয়েছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের আভিযোগ, মানব পাচার বন্ধ করতে ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, করণদিঘি ও চোপড়া থানার পুলিশ উদাসীন। চোরাপথে আসা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে আড়াই হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। সীমান্ত থেকে এনে তাদের প্রথমে ওই চক্রের সদস্যদের বাড়িতে রাখা হয়। পরে সুযোগ বুঝে তাদের কিশনগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া হয়। ইসলামপুরের আলুয়াবাড়ি রোড স্টেশন এলাকার লিচুবাগান এলাকাতেও ওই চক্রের লোকজন আছে। সেখান থেকে চেন্নাই, মুম্বই, পুনে, বেঙ্গালুরু, দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তাদের পাঠানো হয়।

কীভাবে কাজ করে এই সিন্ডিকেটগুলি? ওই সিন্ডিকেটচক্রের এক সদস্য জানান, দুদেশের সীমান্তেই রয়েছে ওই চক্রের সদস্যরা। তারা নিজেদের মধ্যে মোবাইলে যোগাযোগ রাখে। বাংলাদেশের গরিব পরিবারের মেয়েদের এদেশে ভালো বেতনের কাজের প্রলোভন দিয়ে আনা হয়। তাদের পাচার করা হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। সীমান্ত পেরিয়ে দেশের নিরাপদ আস্তানায় পৌঁছাতে প্রয়োজন হয় লাইনম্যান, লিংকম্যান। পুলিশ, বিএসএফের নজর এড়িয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাযিত্ব পড়ে লিংকম্যানদের উপর। সীমান্তের যেসব এলাকায় পাহারা বেশি থাকে সেখান থেকে পার করতে হলে বাড়তি টাকা লাগে। পুলিশ জানায়, সীমান্তের বাসিন্দাদের একাংশের সঙ্গেও সিন্ডিকেটের সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশিদের আত্মীয় সাজিয়ে সাময়িকভাবে তারা বাড়িতে রেখে দেয়। তার জন্য তারা পারিশ্রমিকও পায় সিন্ডিকেটের কাছ থেকে। ওই বাড়ি থেকেই হয় আদবকায়দার প্রশিক্ষণও। পাচারের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি জানান, বাংলাদেশি মহিলাদের এদেশে এনে শাড়ির বদলে চুড়িদার পরানো হয়। কপালে সিঁদুরও দেওয়া হয়। সিন্ডিকেটের লোকরা তাদের পাখি পড়ানোর মতো করে বুঝিয়ে দেয়, ট্রেনে, বাসে, অটোতে তারা যেন বেশি কথা না বলে। কারণ বেশি কথা বললে উচ্চারণের ভঙ্গি দেখে তাদের বাংলাদেশি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। লুঙ্গির বদলে পুরুষদের পরানো হয় শার্ট-ট্রাউজার্স। বাড়তি সর্তকতা হিসাবে বাংলাদেশের দেশলাই, বিড়ি, সিগারেট ব্যবহার বন্ধের নির্দেশও দেওয়া হয়।

ইসলামপুর জেলা পুলিশের সুপার শচীন মক্কর বলেন,  আমাদের কাছে এধরনের খবর নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিজেপির উত্তর দিনাজপুর জেলা সম্পাদক সুরজিত্ সেন বলেন, আমরা যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে। আগামীদিনে অনুপ্রবেশ রুখতে আরও কড়া অবস্থান নেওয়া হবে। বিএসএফ সীমান্তে ভালো কাজ করছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য কোর কমিটির সদস্য জাভেদ আখতার বলেন, দালালদের কোনো দল হয় না। আর এ ধরনের চক্রের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের দলের কোনো সম্পর্ক নেই। দলের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের কাজ করা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।