শাসকদলের হয়ে নির্বাচনে লড়তে ইস্তফা দিলেন চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার

343

কলকাতা: শাসক দলের হয়ে নির্বাচনে লড়তে পদ থেকে ইস্তফা দিলেন হুগলির চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার, ও রাজ্য ক্যাডারের ২০০৩ ব্যাচের আইপিএস হুমায়ুন কবির। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই হুমায়ুন বাবু’র স্ত্রী অনিন্দিতা দাস রাজ্য ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত আরও এক আইপিএসের স্ত্রীর সঙ্গে মিলে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন।

মাত্র ক’দিন আগে হুগলিতে শুভেন্দু অধিকারী ও সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে বিশাল রোড শো হয়েছিল তাতে অংশ নিয়ে বিজেপির যুব মোর্চার সভাপতি সহ অন্যান্যরা ধ্বনি তুলেছিলেন, ‘ দেশকে গদ্দারো কো গোলি মারো।’ আর ওই ধ্বনিকে কেন্দ্র করে নিজেকে শাসকদলের বিশেষ কাছের লোক বলে জাহির করার উদ্দেশ্যে হুগলি পুলিশ কমিশনারেটের প্রধানের নির্দেশে চন্দননগর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিজেপির যুব মোর্চার সভাপতি সহ তিন বিজেপি নেতাকে গ্রেপ্তার করেই ক্ষান্ত হননি বরং ওই দলের ওই তিনজন সহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেন।

- Advertisement -

পুলিশের ওই আচরণকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।কারণ বিজেপির রোড শোয়ের ঠিক আগের দিনই দক্ষিণ কলকাতায় রাজ্যের ২ মন্ত্রী ও এক ঝাঁক প্রথম সারির নেতাদের  উপস্থিতিতে মিছিল থেকে তৃণমূল কর্মীদের স্লোগান দিতে শোনা যায়, ‘দিলীপ ঘোষের চামড়া গুটিয়ে দেবো আমরা। বিজেপির গদ্দারদের গুলি মারো।’ কিন্তু পুলিশ কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি। বিষয়টি বিজেপির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের গোচরে আনা হয়েছিল। এতেই হুমায়ুন কবির বেকায়দায় পড়ে যান। আগে থেকেই গোপনে শাসক দলের নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা পাকা করে ফেলেছিলেন হুমায়ুন বাবু। তারই ফলস্বরূপ এদিন তড়িঘড়ি তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে দেন। কেন ইস্তফা দিলেন এর নেপথ্যে কারণই বা কী সে ব্যাপারে একটি কথাও বলতে রাজি হননি হুমায়ুন বাবু। আর তিনি পদত্যাগ পত্র পাঠাতেই রাজ্য সরকার তড়িঘড়ি তাঁর জায়গায় কলকাতা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার গৌরব মিশ্রকে হুমায়ুন কবিরের জায়গায় চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার পদে নিয়োগ করে দেন। সেইসঙ্গে হুমায়ুন কবিরকে জানিয়ে দেওয়া হয় তিনি যাতে ১ ফ্রেব্রুয়ারির মধ্যে গৌরব মিশ্রকে তাঁর পদের দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেন।

তৃণমূল সূত্রে জানা গেছে যে, রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে হুমায়ূন বাবুকে প্রার্থী করা হচ্ছে।কর্মজীবনে হুমায়ুনবাবু বরাবরই বিতর্কিত আইপিএস বলে পরিচিত। হাওড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কাজ করার সময় তিনি যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে হানা দিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার কুখ্যাত সমাজবিরোধী পিনাকি সহ আরও কয়েকজন দুষ্কৃতীকে গ্রেপ্তার করেন। এরা সকলেই ছিল প্রয়াতঃ সিপিএম নেতা ও মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর কাছের লোক। এর পরপরই হুমায়ূনকে বদলি হতে হয় রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা শাখায়। তবে কিছুদিন বাদেই তাকে বিধান নগরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ করা হয়।আর সেই সময়ে তিনি প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ তথা বিশিষ্ট দৌড়বিদ জ্যোতির্ময় সিকদারের স্বামীর হোটেলে হানা দিয়ে এক ঝাঁক কল গার্ল সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।

এখানেই শেষ নয় মুর্শিদাবাদ জেলার পুলিশ সুপার পদে কাজ করার সময় ওই জেলায় হোমগার্ড নিয়োগকে কেন্দ্র করে তিনি রাজ্যের মন্ত্রী জাভেদ খান ও তদানীন্তন কমান্ডার জেনারেল হোমগার্ড আরএস নালুয়ার সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। আর সেই বিতর্কের জেরে আবার বদলি হতে হয় হুমায়ুন কবিরকে। সেবার তাঁকে পাঠানো হয়েছিল রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের একটি ছোট ব্যাটেলিয়ানের কমান্ডান্ট পদে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তাকে বিধান নগর পুলিশ কমিশনারেট এর ডিসি সদর করা হয়। তবে হাজিপুরের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর হুমায়ুন বাবুকে আবার বদলি হতে হয়। এরপর পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে কলকাতা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার করা হয়েছিল। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে আবার দার্জিলিংয়ের ডিআইজি করে পাঠানো হয়। সেখানেও তাঁকে বেশি দিন থাকতে হয়নি। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাজ্য পুলিশের ট্রাফিক শাখার ডিআইজি পদে। পরে সেখান থেকেই তাঁকে চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেট এর কমিশনার পদে নিয়োগ করা হয়েছিল।পুলিশের চাকরি করার পাশাপাশি হুমায়ুন কবির একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক। তার লেখা বেশ কয়েকটি বই রয়েছে। এছাড়া তিনি একটি চলচ্চিত্রে নির্দেশনার কাজও করেছিলেন।