শিশু কোলে স্ত্রীর লড়াইয়ে বাসুদেবরা

137

শিলিগুড়ি : সাত পাকে বাঁধা পড়ার সময়ে স্ত্রীর ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে তাঁর স্বপ্নপূরণের লড়াইয়ে পাশে থাকার শপথ নিয়েছিলেন প্রশান্তকুমার রায়, বাসুদেব শীল-রা। সংসারে নানা সমস্যার মধ্যেও স্বপ্নের যাতে অপমৃত্যু না ঘটে সেই লড়াইটাই তাঁরা স্ত্রীর পাশে থেকে করে চলেছেন। স্বপ্নের দোরগোড়ায় পৌঁছে স্ত্রী যখন পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত সে সময় শিশুকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার ধারে মাটিতে বসে রইলেন।

রবিবার শহরে জোড়া পরীক্ষা ছিল। আইসিডিএস সুপারভাইজার পরীক্ষা ও দীর্ঘ অপেক্ষার টেট। স্বপ্নপূরণের একধাপ এগিয়ে যাওয়ার এই লড়াইয়ে শিশু কোলে স্ত্রীর পরীক্ষায় সফল হওয়ার কামনায় মগ্ন অভিরূপ দাস-দের ছবিটা দেখে মনে হল, এ হল সত্যিকারের ভালোবাসার বন্ধন। আইসিডিএস সুপারভাইজার পরীক্ষার্থী ও ২০১৭-এর প্রাইমারি টিচার্স এলিজিবিলিটি টেস্ট (টেট)-এর পরীক্ষার্থীদের কাছে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের দিন। লকডাউনের আগে আইসিডিএস সুপারভাইজার পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে সেটি পিছিয়ে যায়। অবশেষে গত শনিবার থেকে দুদিনের পরীক্ষা শুরু হয়। এদিন ছিল শেষ দিন। যাকে কেন্দ্র থেকে গোটা উত্তরবঙ্গ থেকেই প্রার্থীরা হাজির হয়েছিলেন শিলিগুড়িতে।

- Advertisement -

অন্যদিকে, এদিনই ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত টেট। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে চাপা উৎকণ্ঠা ছিল। উৎকণ্ঠা ছিল স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে এই দিনটার অপেক্ষা করে থাকা প্রশান্তকুমার রায়-দের। মায়ের পরীক্ষা প্রস্তুতিতে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে তার জন্য শিশুকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন অশোক দাস-রা। পরীক্ষাকেন্দ্র রাজেন্দ্র প্রসাদ গার্লস হাইস্কুলের সামনে কোলের শিশুকে নিয়ে সঙ্গিনীর লড়াইয়ে শরিক হওয়ার গল্প বলছিলেন আইসিডিএস সুপারভাইজার পরীক্ষার্থী চন্দনা রায়ে স্বামী প্রশান্তকুমার রায়। তিনি বলেন, ছয় বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্ত্রীর আইসিডিএস সুপাইরভাইজার পরীক্ষায় বসার খুব ইচ্ছা। পরিবার থেকে ওর পাশে আমরা সবসময়ে থাকার চেষ্টা করি। অবশেষে সেই সময় এসেছে। দুদিনের পরীক্ষা হওয়ায় শুক্রবার রাতে শহরে আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছি।  ওর পরীক্ষার প্রস্তুতি খুব ভালো হয়েছে। স্ত্রী তো সবসময়ে সন্তানকে দেখে। এই সময় না হয় একটু আমিই দেখলাম। বাগডোগরা থেকে আসা আইসিডিসি পরীক্ষার্থী রাখি শীলের স্বামী বাসুদেব শীল সন্তানকে ফিডিং বোতলে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। তিনি বলেন, সংসারের কাজের মধ্যেও রাখি খুব পড়াশোনা করেছে। এই সময়টায় যদি ওর পাশে না দাঁড়াতে পারি, তাহলে আর কবে দাঁড়াব? পরীক্ষা আলাদা হলেও বাসুদেবদের স্ত্রীর স্বপ্নপূরণে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা মিলিয়ে দিয়েছিল মিলনপল্লির বাসিন্দা পরিতোষ রায়কে। পরিতোষ বলছিলেন, ২০১৭-এর টেট হবে শুনেই  স্ত্রী অঞ্জলির মধ্যে একটা উৎসাহ দেখছিলাম। প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে আসল কারণটা বুঝতে পারি। কিন্তু দুধের শিশু  ওর কাছে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। গত সাতদিন ধরে যখনই সময় পাচ্ছি সন্তানের দেখাশোনা আমি করার চেষ্টা করছি। আসলে একে অপরের পাশে না দাঁড়ালে সেটাকে যে আর সম্পর্ক বলা যায় না। দিনের শেষে দুটি পরীক্ষাই নির্বিঘ্নে কেটেছে। পরীক্ষা শেষে স্বামীর কাছ থেকে শিশুকে তুলে নিয়ে কিছুটা আবেগঘন হয়ে পড়লেন অঞ্জলি রায়। তিনি বললেন, অবশেষে পরীক্ষা দিতে পারলাম। অঞ্জলিদের মুখে হাসি দেখে আবেগকে মনে ধরে রেখেই শান্তির শ্বাস ফেললেন পরিতোষরা।