উনি আমাকে নায়িকা করবেন, ভাবতেই পারিনি

59

মাধবী মুখোপাধ্যায়

সত্যজিৎবাবুর কি আমাকে পছন্দ হবে? মনে তো হয় না। তা হলে আর খামোকা টাকা খরচ করে, ট্যাক্সি চেপে ওঁর বাড়ি গিয়ে লাভ কী? এমনিতেই তখন আমাদের অভাবের সংসার। মা-বোনেরা মিলে থাকি উত্তর কলকাতার কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিটে। সেখান থেকে দক্ষিণ কলকাতায় সত্যজিৎবাবুর ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোডের বাড়ি বেশ দূর। ট্যাক্সিতে অনেক টাকা ভাড়া। সেই ভেবেই আর ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতে প্রথমে রাজি ছিলাম না। ওদিকে ততদিনে আমার বাইশে শ্রাবণ, আজ কাল পরশু ছবি রিলিজ করে গিয়েছে। ছবিতে আমার অভিনয় দেখে সত্যজিৎবাবুর ভালো লেগেছিল। তাই বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন ওঁর ইউনিটের সদস্য অনিল চৌধুরী আর দুর্গা সেনকে। ওঁর মহানগর ছবির কারণে দেখা করার জন্য। কিন্তু অহেতুক ট্যাক্সি ভাড়া করার ব্যাপারে আমার দ্বিধাগ্রস্ত মন বুঝে ওঁরা বলেছিলেন, আপনার ট্যাক্সি ভাড়াটা নিয়ে রাখুন। লজ্জায় অবশ্য নিইনি। তবে ওঁদের কথামতো নির্দিষ্ট সময়ে দেখা করতে গিয়েছিলাম ওঁর সঙ্গে। দেখা হল, কথা হল। কথার মাঝে চা-চানাচুর এল। তবে সত্যি বলতে, সত্যজিৎবাবুর মতো পরিচালককে প্রথম দেখায় কোনও রোমাঞ্চই অনুভব করিনি সেদিন মনে। কারণ ছবছর বয়স থেকে অভিনয় করছি। মঞ্চে অভিনয় করেছি নরেশ মিত্র-মহেন্দ্র দাশগুপ্ত-নির্মলেন্দু লাহিড়ী-শিশির ভাদুড়ির মতো অভিনেতাদের সঙ্গে। অভিনয় করে ফেলেছি পরিচালক তপন সিনহার টনসিল, মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ, ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখা ছবিতে। তাই ওঁকে প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল মৃণালদা-ঋত্বিকদার মতো ব্যক্তিত্বকে দেখার পর, আর এক ব্যক্তিত্বকে দেখলাম। এটুকুই যা। টুকটাক কথা বলার পরে উনি বললেন, ঠিক আছে, আমি এখন অভিযান ছবির কাজে আউটডোরে যাচ্ছি। ফিরে এসে কথা হবে। আমিও ভেবে নিলাম, আমি বাতিল হয়ে গিয়েছি। কারণ পাত্র-পাত্রী বাতিল করার সময়, অনেকে এমন কথাই বলে থাকেন। কিন্তু দেখলাম বেশ কিছুদিন পরে আউটডোর থেকে ফিরে, উনি আমায় ফের ডেকে পাঠালেন। ডেকে স্ক্রিপ্ট শোনালেন। তখনও ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এরপর উনি আমার হাতে চিত্রনাট্য তুলে দিয়ে বললেন, ভালো করে পড়ো। সেই চিত্রনাট্য হাতে পাওয়ার পরই বিশ্বাস করলাম, এবার তা হলে আমি ওঁর ছবির নায়িকা হচ্ছি।

- Advertisement -

আসলে আমার অমন অবিশ্বাসের কারণ, আমি তো আর তেমন অসাধারণ মেয়ে ছিলাম না। ছিলাম খুব সাধারণ। তা হলে উনি আমায় মহানগর-এর নায়িকা করতে যাবেন কেন? কিন্তু ছবির গল্পের নায়িকা আরতি-ও ছিল এক অতি সাধারণ মেয়ে তাই হয়তো চরিত্রটা করতে পেরে খুব খুশি হয়েছিলাম। কারণ তার আগে পর্যন্ত আমি যা ছবি করেছি, সমস্ত পুরুষ-প্রধান গল্প। জীবনে প্রথম মহানগর-এ করেছিলাম নারীপ্রধান চরিত্র। যেখানে গল্পে সাধারণ ঘরের মেয়ে আরতি সেলসের চাকরি করতে গিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরের জগতে পা রাখে। তারপর ধীরে ধীরে মনের জোরে নিজের আত্মবিশ্বাস, পরিচিতি গড়ে তোলে। সাবলম্বী হয়। পরে অন্য মেয়ের সমর্থনেও সামনে এসে দাঁড়ায়। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প অবলম্বনে চমৎকার ছবি।

আর সেই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছিলাম কী অসাধারণ মাপের পরিচালক উনি। যেমন অপূর্ব চিত্রনাট্য লেখনী, তেমনই ফাইনাল শট দেওয়ার আগে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেওয়ার দক্ষতা। সত্যি বলতে ওঁর সেই বোঝানোর পর, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের খুব বেশি কিছু আর করারও তেমন থাকত না। আর একটা জিনিস প্রথম থেকে লক্ষ্য করেছিলাম, নিজের সৃষ্ট চরিত্রের ক্ষেত্রে তীক্ষ্ন নজর ছিল ওঁর। কারণ আমি বরাবরই একটু-আধটু পান খাই। প্যাক-আপের পরে পান খেলে, ওঁর তাতে কোনও আপত্তি ছিল না। কিন্তু শটের ফাঁকে পান খেলেই ঠিক ধরতেন। বলতেন, মাধবী, তুমি পান খেয়েছ? যাও, আগে ভালো করে মুখ ধুয়ে এসো। কারণ ছবিতে মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের অতি সাধারণ স্ত্রী আরতির অপটু হাতে লিপস্টিক পড়ার দৃশ্যটা ছিল ছবির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দৃশ্য। তাই ঠিক আমার দিকে খেয়াল রেখে বলতেন, মাধবী, খুব ভালো করে মুখ ধোবে। দেখবে কোনও রকম পানের লাল আভা যেন ঠোঁটে লেগে না থাকে। আবার কাজ না থাকলে উনিই বলতেন, যাও মাধবী, এবার ভালো করে পান খাও। মনে রয়েছে, ওই ছবি শেষ করার আগেই উনি আমায় বলেছিলেন, আমরা আবার একসঙ্গে কবে কাজ করতে পারব? শুনে চমকে গিয়েছিলাম। কারণ ভাবতেই পারিনি আমাকে এমন কথা বলতে পারেন মানিকদা। কারণ এটা তো ছিল আমারই মনের কথা, যা বলে দিলেন মানিকদা! প্রথম ছবির সুবাদে কাজ করতে গিয়ে সত্যজিৎ রায় ততদিনে সকলের মতো আমার কাছেও হয়ে গিয়েছিলেন মানিকদা।

দুজনের আবার একসঙ্গে কাজ করার জন্য আদৌও দেরি করতে হয়নি। কারণ মহানগর শেষ হতে, কিছুদিনের মধ্যেই মানিকদা আমাকে ফোন করে বললেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নষ্টনীড় গল্পটা পড়তে। আমার পড়া রয়েছে বলাতে উনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, আবার পড়ো। তার কিছুদিন বাদে উনি বাড়িতে ডেকে আমায় চিত্রনাট্য পড়ে শোনালেন। জানলাম ছবির নাম চারুলতা। কিন্তু দেখলাম সেই চিত্রনাট্যে শেষ দৃশ্য কিছুই লেখা নেই। শেষ দৃশ্য কী হবে? আমতা আমতা করে জানতে চাইতে বললেন, সে পরে হবে। এমন রাশভারী স্বভাবের মানুষ ছিলেন যে, তারপর আর একটা কথাও বাড়াতে পারিনি। শেষ দৃশ্যে যেমনটি অভিনয় করতে বলেছিলেন, তেমনটি করেছিলাম।

ছবিটা শেষ করে স্টুডিওর একটা জায়গায় টেকনিশিয়ান্স-আর্টিস্ট সকলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি দেখতে দেখতে মানিকদা বলেছিলেন, ছবিটা তো খুব ভালো হয়েছে ভাই, কিন্তু চলবে কি না জানি না। মনে রয়েছে আর একটা মজার দৃশ্যের কথা। এমনিতে মানিকদার যে তিনটে ছবিতে কাজ করেছি, তার কোনওটাতেই আউটডোর তেমন ছিলই না। ফলে শুটিং শেষে সেই মেকআপ তোলা, কস্টিউম বদলে পোশাক পরে বাড়ি ফেরা। গোটা চারুলতা ছবির শুটিংটাই তো হয়েছিল ১ নম্বর স্টুডিও, মানে নিউ থিয়েটার্স ওয়ান-এ। মানিকদার ছবিতে আমার আউটডোর বলতে চারুলতা ছবিতে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন। যেখানে ওই দোলনায় বসে শটটা হয়েছিল। এছাড়া গোপালপুর সমুদ্র। যেখানে সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে চারু-র স্বামী তাঁকে বলছেন, আবার কাগজ বের করবেন। আর কাপুরুষ ছবির জন্য একবার গিয়েছিলাম মালবাজার। ব্যস ওইটুকুই। তা সেই গোপালপুর গিয়ে দেখেছিলাম, কাজের শেষে মানিকদা কয়েকজনের সঙ্গে বসে টোয়েন্টি নাইন খেলছেন! দেখে খুব মজা পেয়েছিলাম। কারণ মানিকদা যে ধরনের ব্যক্তিত্ব, তাতে তাস খেললে ব্রিজ খেলবেন। কিন্তু টোয়েন্টি নাইন! পরক্ষণেই ভেবেছিলাম, আরে! মানিকদা হলেও মানুষ তো রে বাবা।

তবে কাজের ক্ষেত্রে ওঁর সম্পর্কে বলতে পারি, আমি মৃণাল সেনের সঙ্গে কাজ করেছি, ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করেছি। সকলেই যে যাঁর জায়গায় সেরা। কিন্তু সকলের মধ্যে মানিকদা নিঃসন্দেহে এক নম্বর। সব দিক থেকে নিখুঁত। সব দিক থেকে সেরা। যেমন চিত্রনাট্য, ছবি আঁকা। তেমন ফাইনাল শটের আগে শটটা বুঝিয়ে দেওয়ার দক্ষতা, পোশাক সেন্স, সংগীতজ্ঞান, কিচ্ছু বলার নেই। অসাধারণ। আর সেই অসাধারণ মাপের মানুষটার সঙ্গে তিনটে ছবি করার সুবাদে আমাদের মধ্যে সুন্দর একটা জুটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। একটা সময় পরিচালক হিসেবে হরিদাস ভট্টাচার্য মানেই যেখানে চলে আসত নায়িকা কাননদেবীর নাম। অসিত সেন বললেই চলে আসত সুচিত্রা সেনের নাম। সেখানে তখন সত্যজিৎ রায় মানেই সিনেমাপ্রেমীর মনে ভেসে উঠত আমার নাম। কিন্তু নানা রাজনৈতিক কারণে সেই সময় কিছু কথাবার্তা, জটিলতা আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে। যেগুলোকে অগ্রাহ্য, অবহেলা করে আমার পক্ষে আর ওঁর সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই সরে দাঁড়িয়েছিলাম ওঁর থেকে। কারণ আমি শান্তি চেয়েছিলাম। কোনও রকম অশান্তি-রাজনীতি পছন্দ করি না। তখনও করিনি। তাই ওঁর সঙ্গে আর ছবি করতে চাইনি।

ওঁর সঙ্গে আমার মোট তিনটে ছবিতে অভিনয়। মহানগর, চারুলতা, কাপুরুষ। আবার ওঁর নায়ক, অশনি সংকেত, ঘরে বাইরে মোট তিনটে ছবিতেই আমায় নায়িকা হওয়ার আমন্ত্রণে আমি না জানিয়ে দিয়েছিলাম। ওঁর সঙ্গে কাজ করতে চাইনি। নায়ক-এর অদিতি, যেটা শর্মিলা ঠাকুর করেছেন, অশনি সংকেত-এর অনঙ্গ, যেটা বাংলাদেশের ববিতা করেছেন, আর ঘরে বাইরে-র বিমলা, যে চরিত্রটা স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত করেছেন, সেই তিনটে চরিত্রই করার জন্য মানিকদা নিজে আমায় ফোন করেছিলেন। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হতে পারিনি। এমনকি নায়ক, অশনি সংকেত ছবিকে না বলার প্রায় দশ বছর বাদেও মানিকদা আমায় তাঁর ঘরে বাইরে করতে বলেছিলেন। মানিকদার সঙ্গে ওঁর প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক সেবাব্রত গুপ্তও আমায় অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছি কারণ নতুন করে আবার অপ্রিয় কোনও কথা শুনতে চাইনি।

তা বলে আমার সঙ্গে মানিকদার সম্পর্ক কোনও দিনই খারাপ হয়নি। মুখ দেখাদেখি, কথা বলা বন্ধ হয়নি। নানা অনুষ্ঠানে, বিয়েবাড়িতে দেখা হলেই আমাদের কথা হত। মনে রয়েছে, আমার আর সৌমিত্রদার নাটক ফেরা দেখতে উনি সস্ত্রীক এসেছিলেন। নাটক শেষে কথাও হয়। সেই দেখাই সম্ভবত মানিকদার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।

( সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুলিখনঃ সুমিত দে)