কোভ্যাকসিন: তাড়াহুড়োয় হতে পারে বিপরীত ফল, দাবি বিশেষজ্ঞদের

432

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত, নয়াদিল্লি: বাজারে আসছে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক ‘কোভ্যাকসিন’। আগামী ১৫ অগাস্ট দেশের ৭৪তম স্বাধীনতা দিবসের পুণ্যতিথি উপলক্ষ্যে করোনার প্রতিষেধক ‘কোভ্যাকসিন’ দেশিয় বাজারে ছাড়ার সংকল্প নিয়েছে আইসিএমআর। বলাবাহুল্য এই খবরে একদিকে যেমন খুশির হাওয়া, অন্যদিকে ততোধিক চিন্তায় ফেলেছে বিশেষজ্ঞদের। কারণ তাঁরা মনে করছেন, এভাবে আগে থেকে সুনির্দিষ্ট ডেডলাইন জারি করে প্রতিষেধক বাজারে আনা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

একটি মারণব্যাধি যার প্রতিষেধক বের করা অত্যন্ত কঠিন কাজ, এ মূহুর্তে পৃথিবীর তাবড়-তাবড় দেশ যার নাগাল পায়নি, রাতারাতি ঘটা করে তার প্রচার এমনকি ওষুধ বাজারে নিয়ে আসার দিনক্ষণ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যাওয়ার তত্ত্বে ভরসা রাখতে পারছেন না স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। আইসিএমআরের এই রকম পদক্ষেপকে তীব্র সমালোচনা করেছেন তাঁরা। এমনকি সতর্ক করেছেন এই বলে যে প্রচারের লোভে তাড়াহুড়ো করে এই ভ্যাকসিন বের করলে ফল উল্টো হতে পারে।

- Advertisement -

আইসিএমআর সচিব বলরাম ভার্গবের একটি চিঠি প্রকাশ্যে আসলে ব্যাপক হইচই শুরু হয়েছে। সে চিঠিতে ভার্গব জানিয়েছেন, করোনা প্রতিষেধক বিবিভি১৫২ কোভিড ভ্যাকসিন অথবা কোভ্যাকসিন সমস্ত ক্লিনিকাল ট্রায়াল শেষ করে আগামী ১৫ অগাস্ট সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বাজারে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা আইসিএমআর ও হায়দরাবাদের বিবিআইএল বা ভারত বায়োটেকের যৌথ উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে। আইসিএমআর সচিব সেই চিঠিতে এও বলেছেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে লক্ষ্যপূরণ না হলে তা গুরুতর ব্যার্থতা বলে গণ্য করা হবে। তাই, সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এর কাজ শেষ করার দ্রুত নির্দেশ দিয়েছে আইসিএমআর। এমনকি এও বলা হয়েছে, যাঁদের ওপর টেস্ট করা হবে (মানবশরীর) তাঁদের নথিভুক্তিকরণ ৭ জুলাইয়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। আর এই নিয়েই শুরু হয়েছে বিবাদ। ভারত বায়োটেক এই চিঠির বিষয়ে কিছু জবাব না দিলেও প্রবল প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের তরফে।

এই চিঠির বিষয়ে ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ মেডিকেল এথিকসে’-এর সম্পাদক অমর জেসানি বলেছেন, ‘পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে এভাবে ডেডলাইন দিয়ে কোন মারণব্যাধির প্রতিষেধক বানানোর নজির নেই।’ তিনি এও বলেন, ‘এ পদ্ধতি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।’

আইসিএমআরের এথিক্স কমিটি চেয়ারম্যান বসন্ত মুথুস্বামী জানান, তিনি চিঠিটি পড়ে দেখেননি। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এভাবে মাত্র একমাসের মধ্যে দিনক্ষণ নির্ধারিত করে ক্লিনিকাল টেস্ট করা সম্ভব নয়। এর জন্য ন্যুনতম ছ’মাস থেকে একবছর সময় প্রয়োজন, অন্যথায় হিতে বিপরীত ফল হতে পারে।

উল্লেখ্য, সরকার অনুমোদিত ডিজিস ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল রেজিস্টারেও ওই একই সময়সীমা নির্ধারিত করা রয়েছে। বহু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই ট্রায়াল কিন্তু কোনও প্রাণীর ওপরে নয়, বরং মানুষের ওপর করা হবে। ফলে তাড়াহুড়ো করে ট্রায়াল করলে যদি কারও প্রাণহানি হয় তার দায় কি আইসিএমআর নেবে?

এই ক্লিনিকাল টেস্টের সঙ্গে জড়িত বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই চিঠি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ভিত্তিহীন। টেস্ট বিষয়ক চূড়ান্ত ছাড়পত্র না পেলে তাঁরা এতে যুক্ত হবেন না। তাঁদের দাবি, যদি এথিক্স কমিটি এতে অনুমোদন না দেয় তবে জুলাই ৭ কেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও যদি তাড়াতাড়ি করে ভ্যাকসিন ট্রায়ালের কথা বলেন, তাও তাঁরা করবেন না। বলা বাহুল্য পুরো বিষয়টি এখন দাঁড়িয়ে আছে আইসিএমআরের এথিক্স কমিটির ছাড়পত্রের উপর।

প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই তাড়াহুড়ো? কেনই বা ১৫ অগাস্টে লালকেল্লা থেকে হবে এর প্রচার? পুরো বিষয়টির মধ্যে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ ও চড়া দাগের রাজনৈতিক মুনাফার গল্প রয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। কারণ যাই হোক রোগের প্রতিষেধক বের করতে গিয়ে এমন নজিরবিহীন তাড়াহুড়ো ও মানুষের প্রাণের কথা না ভাববার ফলে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক ও আইসিএমআর।