অরুণ ঝা, ইসলামপুর : ইসলামপুর জেলা পুলিশের অধীনে থাকা বিভিন্ন থানা এলাকায় কোটি কোটি টাকার অবৈধ গোলাবারুদ মজুত রয়েছে। মজুত গোলাবারুদের বাজারমূল্য কমপক্ষে ৪ কোটি টাকা। এমনই চাঞ্চল্যকর খবর জানিয়েছে অপরাধজগতের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র। ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা দিলে ইনসাস রাইফেলের ইম্প্রোভাইজড ভার্সনের ডেলিভারি দেওয়ার মতো মারাত্মক তথ্যও পাওয়া গিয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব আঁচ করতে পেরে জেলা পুলিশ এই মর্মে নতুন ব্লু প্রিন্ট তৈরি করতে শুরু করেছে। ইসলামপুরের পুলিশ সুপার শচীন মক্কর এলাকায় অবৈধ গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র মজুত থাকার কথা স্বীকার করে নিযে অ্যান্টি ক্রাইম সেল খোলার কথা জানিয়েছেন।

একসময় ভৌগোলিক অবস্থানে ইনটেলিজেন্সের তালিকায় চিকেন নেক বলে পরিচিত ইসলামপুর আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের করিডর ছিল মাত্র। বাম আমলের শেষের দিক থেকেই চোপড়া এবং ইসলামপুর থানার বিস্তীর্ণ এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত করার কাজ শুরু হয়। মূলত রাজনৈতিকভাবে এলাকা শাসন করতে ও দখলে রাখতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এই বিপজ্জনক মানসিকতা তৈরি হয়। সমযে সঙ্গে এলাকায় মজুত গোলাবারুদের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি, শুরু হয় আগ্নেয়াস্ত্রের কারবার। চাহিদা আঁচ করতে পেরে অস্ত্র মাফিয়ারাও এলাকায় শিকড় মজবুত করতে শুরু করে। ক্রমে আগ্নেয়াস্ত্রের কারবার এলাকায় বটবৃক্ষের আকার নেয়।

বিশেষ করে গত পঞ্চায়েত ভোট থেকে এলাকায় গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্রের দাপট সাংঘাতিকভাবে বাড়তে শুরু করে। চোপড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক মাস ধরে লাগাতার মুড়িমুড়কির মতো বোমা এবং গুলি চলেছে। প্রাণ গিয়েছে একাধিক। সম্প্রতি, ইসলামপুরের আগডিমটিখন্তি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক মহিলার মৃত্যু হয়। ইসলামপুর শহরের বুকেও পুলিশের সঙ্গে দুষ্কৃতীদের গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। ওই ঘটনাতেও এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। শহরের হাসপাতাল পাড়াতেও এক গৃহবধূর উপরও বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। বরাতজোরে ওই গৃহবধূ বেঁচে য়ান।

সবচেযে ভয়ের কথা, টাকা খরচ করতে চাইলে একদিনেই চোপড়া, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া এবং ইসলামপুরে সিক্সার, নাইন এমএম রিভলভার, দোনলা বন্দুকের ডেলিভারি পাওয়া যাচ্ছে। পরিমাণে বেশি হলে ৩ থেকে ৭ দিন সময় লাগছে। ইনসাস রাইফেলের ইম্প্রোভাইজড ভার্সনকে অস্ত্র মাফিয়ারা একে ৪৭-এর কার্বন কপি বলে বাজারে চালানোর চেষ্টা করছে বলেও অন্তর্তদন্তে খবর মিলেছে। কোটি কোটি টাকার অবৈধ গোলাবারুদ এলাকায় মজুত থাকার বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। সূত্রগুলি বলছে, সবাই সব কিছু জানে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সবাই নীরব দর্শক সেজে রয়েছে। কারণ এই এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্রের কারবারের নেপথ্যে মূল কারিগর রাজনৈতিক দলগুলির অ্যাকশন স্কোয়াড। রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটের কথা মাথায় রেখে অস্ত্রের কারবারের রমরমা চলছে। গোয়ালপোখর এবং চাকুলিয়া থানা এলাকাতেও অস্ত্র মাফিয়ারা জাল ছড়াতে শুরু করেছে। ইতিপূর্বে ডালখোলা থানা এলাকার একটি মাদ্রাসা চত্বরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার নজিরও রয়েছে। ফলে সব মিলিযে উদ্বেগে রয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

পুলিশ সুপার বলেন, এলাকায় অবৈধ গোলাবারুদ মজুত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না। এই কারবারের উপর লাগাম পড়াতে ইসলামপুর জেলা পুলিশ আলাদাভাবে অ্যান্টি ক্রাইম সেল খুলছে। দক্ষ পুলিশ অফিসারদের এই সেলে রাখা হবে। যাঁরা শুধুমাত্র এই বিষযে ফোকাস করবেন। পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর বা থানাগুলি ল অ্যান্ড অর্ডার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাদের এই পরিকল্পনায় রাখা হয়নি। তবে গোটাটাই টিম ওয়ার্ক হবে। লাইসেন্স থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের রিভিউ আমরা শুরু করেছি। যাঁদের আর আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োজন নেই তাঁদের লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশ উপরতলায় পাঠানো হচ্ছে। অ্যান্টি ক্রাইম সেল জানুয়ারি মাসের মধ্যে তাদের কাজ শুরু করে দেবে। আশা করি এতে গোলাবারুদের অবৈধ কারবার অনেকাংশেই বন্ধ হবে।