টাকা উড়ছে হিলিতে, ফুলছে নেতা-অফিসারদের পকেট 

1445

বিধান ঘোষ, হিলি : লাইন শব্দটি ইংরাজি। সহজ-সরল অর্থে বাংলা মানে রেখা। সেই লাইন কত অর্থে যে ব্যবহার হয়, রেশনের লাইন, চাকরির লাইন, এমনকি প্রেম করা অর্থেও লাইন। এই লাইন মানে কিন্তু তোলাবাজিও। বলা যায় তোলাবাজির লাইসেন্সও। তোলা আদায়ে বরাত পেতে মোটা টাকা দিয়ে লাইন কিনে নেয় কেউ। এর সঙ্গে জড়িয়ে চোরাচালান। হিলি মানে সীমান্ত। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দক্ষিণ দিনাজপুরের একটি গঞ্জ। অথচ কোটি কোটি টাকা হাওয়ায় ওড়ে। সীমান্ত পার করে স্থলবন্দর দিয়ে কার মাল আগে যাবে, ঠিক করে দেবে তোলাবাজ। আবার চোরাগোপ্তা কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে মাল পাচার অবাধে হবেই না তোলাবাজদের টাকা না দিলে। এই তোলাবাজরা হিলিতে পরিচিত লাইনম্যান নামে।

এরা মোটেও পাড়ার ছিঁচকে তোলাবাজ নয়, প্রত্যেকেই কোটিপতি। লাইন কিনে নিতে হয় এদের। কিনতেও কয়েক কোটি টাকা লাগে। আর লাইন কেনা মানে সারাজীবনের জন্য তোলাবাজির লাইসেন্স পাওয়া, এমনও নয়। মাঝে মাঝে লাইনম্যান বদলে যায়। কেন বদলায়? হিলির হালহকিকত যাঁরা জানেন, তাঁরাই বলতে পারবেন, এই লাইনের টিকি বাঁধা রাজনৈতিক দলের নেতাদের হাতে। মূলত জেলা স্তরের শীর্ষ নেতাই চক্রের মূল পান্ডা। তিনিই ঠিক করেন, লাইন কার হাতে দেবেন। দেওয়ার বিনিময়ে কয়েক কোটি টাকা ঢোকে সেই নেতার পকেটে। এই যেমন মাস কয়েক আগে ৩ কোটি টাকা ঢুকেছিল। শীর্ষপদ থেকে সেই নেতা কোনও কারণে সরে গেলে লাইনম্যান পালটায়। নেতা তখন নিজের পছন্দের অন্য কাউকে লাইনম্যান করেন। তবে এই পছন্দে কথা বলে টাকার পরিমাণ। অলিখিত টেন্ডারে যে বেশি দর দেবে, তার হাতেই লাইনম্যানের গুরুদায়িত্ব গুঁজে দেবেন সেই শীর্ষ নেতা।

- Advertisement -

লাইনম্যানের ভার কে পেল, তা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জেনে যায় পুলিশ, প্রশাসন, পরিবহণ, ভূমি, আবগারি ইত্যাদি নানা সরকারি দপ্তরের কর্তারা। প্রচলিত প্রথা হল, এই কর্তারা সেই নির্দিষ্ট লাইনম্যানকে ডেকে পাঠান। সেখানে তাঁদের সঙ্গেও লাইনম্যানদের রফা হয়। মাসোহারা তো আছেই, তার পর থাকে নানা আবদার। বিশেষ করে হিলির লাইনম্যানদের কাছে সরকারি বাবুদের সবচেয়ে বেশি চাহিদা হল পদ্মার ইলিশ। তার ওপর কারও কর্তার ছেলের জন্মদিন, কারও মেয়ের বিয়ে তার রসদ জোগানো লাইনম্যানদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। বোঝাই যাচ্ছে, এই দিতেথুতেও বেশ ভালোই গুণাগার দিতে হয় লাইনম্যানকে। তাহলে কারবার কত টাকার, তা সহজে অনুমেয়। কিন্তু কারবারটা ঠিক কী? যে কেউ হিলিতে এলে মালুম পাবেন। সব ওপেন সিক্রেট। দুটি উপায়ে কারবার। এক খোলা সীমান্ত বা কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে বাংলাদেশে পাচার। কী যায় না তাতে? বেনারসি শাড়ি, নানা প্রসাধন সামগ্রী, গাঁজা, ফেনসিডিল সিরাপ, মাদক হিসেবে ব্যবহারের কুপেজেসিক ইনজেকশন, ইয়াবা ট্যাবলেট আরও কত কী। এজন্য সীমান্তের আশপাশে গুদাম আছে। অবশ্যই অনুমোদনহীন। সেখানে মালপত্র জমা হয়। তারপর লাইনম্যানের সবুজ সংকেত পেলে একদল লোক সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেয় সেইসব মাল। এদের বলা হয় ক্যারিয়ার। ওদের কাজ এতটুকুই। পরের কাজটা যাদের, তাদের বলা হয় ভাঁড়ি। সীমান্ত পার করে মাল বাংলাদেশে পাঠানোর দায়িত্ব এদেরই। সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে কাজটা করার জন্যই এদের কদর। কখনও আবার সীমান্ত ম্যানেজ করা হয়। এই কারবারগুলি অনেকের। প্রত্যেককে মোটা টাকা নজরানা দিয়ে এই নির্বিঘ্নে পাচারের লাইসেন্স পেতে হয় লাইনম্যানকে। প্রতি রাতেই কয়েক কোটি টাকার কারবার চলে। লাইনম্যানদের তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় পথটি হল স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহণে তোলাবাজি। হিলির স্থলবন্দরে এখনও পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে ওজনের কোনও ব্যবস্থা নেই। এই সুযোগে রপ্তানিতে চলে অবাধে ওভারলোডিং। ১৬ টন বহনের আইন থাকলে সেই গাড়িতে চলে যায় প্রায় দ্বিগুণ মাল।

কী মাল যায়? প্রশ্নটা হওয়া উচিত, কী যায় না। তবে লাইনম্যানদের পছন্দের কারবার হল পাথর রপ্তানি। মূলত ঝাড়খণ্ডের পাকুড় থেকে বাংলাদেশে পাথর যায় হিলি স্থলবন্দর পার করে। ট্রাকের চাকা সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে তোলার দর বাড়ে কমে। ১০ চাকার ট্রাকের যে দর, তার থেকে অনেক বেশি মূল্য ধরে দিতে হয় ১৬ চাকার ট্রাকের জন্য। একবার টাকাটা দিয়ে দিলেই হল। তারপর কত পরিমাণ মাল রপ্তানি হল নিয়ম ভেঙে, তা কেউ তাকিয়ে দেখবে না। এমনকি স্থলবন্দরের কর্তারাও না। মাল যাতে নির্বিঘ্নে যায়, সেজন্য স্থলবন্দরের অনেককে দায়িত্ব দেওয়া থাকে। পাহারাদারদের হোয়াটসঅ্যাপে আগাম বার্তা পৌঁছে যায়, লাইনম্যানের ছাড়পত্র পাওয়া গাড়ির নম্বর। কাশ্মীরী আপেল সহ আরও নানা পণ্য নিয়ম ভেঙে পার করার অবাধ বন্দোবস্ত। গাড়িপ্রতি এই তোলাবাজির নাম সেলামি। এই সেলামির অংশই সরকারি কর্তাদের মাসোহারা। সেলামির দর লরিপ্রতি প্রত্যেক ট্রিপের জন্য দুহাজার করে দিতে হয়। কিছু লরির জন্য আবার বাড়তি কর ধার্য হয়।

এছাড়া বাড়তি প্রণামী দিলে লাইনে অপেক্ষা করারও দরকার নেই, আগেই সেই পণ্য বোঝাই লরি বাংলাদেশে চলে যাওয়ার ছাড়পত্র পাবে। ডাম্পিংয়ের কালো কারবার আছে। ডাম্পিং মানে পাথর মজুত রাখার জায়গা। সেজন্য অনুমোদিত জমি যতটা, অনুমোদনহীন জমি তার চেয়ে বেশি। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাকে টাকা দিয়ে এই লাইন কেনার প্রতিবাদ হয় না কেন? ভিন্ন দলের নেতারা তো প্রতিবাদ করতে পারেন। করবেন কী করে? তাঁদেরও অনেকের টিকি বাঁধা এই কারবারে। তাছাড়া হিলিতে ৮ থেকে ৮০, কেউ ক্যারিয়ার, কেউ ভাঁড়ি, কেউ পাহারাদার, কেউ অন্য ভাবে কারবারে যুক্ত। এব্যাপারে রাম, বাম, ঘাসফুলে কোনও ভেদ নেই। সব দলের সমর্থকরাই জড়িত। প্রতিবাদের তাই প্রশ্নই ওঠে না। আর প্রশ্ন করলে মাদক আইনে জেলের ঘানি টানাতে কতক্ষণ?

এপ্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি। দিনকয়েক আগে এক রাতে এক গাঁজা ব্যবসাযীর সঙ্গে একজন পুলিশকর্মীর বচসা হয়। সেই ব্যবসায়ী পুলিশকর্মীটিকে প্রকাশ্যে ১৫ মিনিটে বদলি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি অকথ্য ভাষায় নানা মন্তব্য করে। ব্যবসায়ীটি সবার সামনে বলতে শুরু করে, মাসে সে কত টাকা কোন অফিসারকে দেয়। পরে পুলিশ তাকে বাজার থেকে পাকড়াও করে নিয়ে যায় বটে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, কার প্রশ্রয়ে এমন গোপন কথা সে বলে দিতে পারে অবলীলায়। পুলিশের নিশ্চয়ই তাহলে দুর্বলতা রয়েছে। এমন পুলিশ অফিসারদের আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি, যাঁরা ৫১২ নম্বর জাতীয় সড়কে দাঁড়িয়ে গাঁজা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলা নেন, চোরাচালানকারীদের কাছ থেকে প্রসাধনী সামগ্রীও নেন। দূরের অনেক পুলিশ আধিকারিকদের জানি, যাঁরা হিলিতে এসে প্রণামী নিয়ে যান প্রতিমাসে। সীমান্তরক্ষীদের একাংশকে ম্যানেজ করে ভাঁড়িরা। তাই রাতের নির্দিষ্ট কোনও সময়ে সীমান্তে টহলদাররা উধাও হয়ে যায়। সেই ফাঁকে ওপারে চলে চোরাচালান।

এই ব্যবসায় দাদাগিরি ওই লাইনম্যানদের। এদের নানা সাংকেতিক নামও আছে, যেমন গণেশ টেপা, লেবুলংকা, ডাকাত সর্দার। লাইন কবজা করতে এদের মধ্যে দড়ি টানাটানি চলে বিস্তর। লাইন নিতে প্রথম ধাপে ওপরে কোটি টাকা দিতে হয়। তারপর প্রতিমাসে চুঙ্গি কর তো আছেই। সম্প্রতি আর জেলা স্তরে নয়, লাইন বণ্টনের কাজটা হচ্ছে কলকাতায়। কয়েক মাস আগে যে নেতাকে ৩ কোটি টাকা দিয়ে লাইন কিনেছিল একজন, সেই নেতার আপাতত পদ নেই। ফলে সেই লাইনম্যানের আপাতত লাইন নেই। নতুন লাইনম্যান নিযুক্তির তৎপরতা চলছে। এই প্রথা বাম আমলেও ছিল। জমানা বদলের সঙ্গে সঙ্গে চোরাকারবারিরাও পক্ষ পালটেছেন। মাস দুয়েক আগেও ত্রিমোহিনীতে একজন ঘটা করে দলবদল করেছেন। সেইদিন বিকেলেই পুরস্কার হিসাবে তিনি এক্সপোর্ট কমিটিতে মনোনীত হয়ে গিয়েছেন। সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে তাড়াবে কে?