মেশানো সর্ষের তেলের রমরমা কারবার উত্তরবঙ্গে

1097

সৌরভ রায়, কুশমণ্ডি : উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ ছাড়িয়ে ভেজাল সর্ষের তেল বা মিক্সড সর্ষের তেল তৈরির কারবার ছড়িয়ে পড়েছে শিলিগুড়ি থেকে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুশমণ্ডিতেও। ভেজাল সর্ষের তেল তৈরি বন্ধ করতে উত্তর দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের সক্রিয়তায় অসাধু কিছু তেল ব্যবসায়ী তাদের ঘাঁটি বদলাতে বাধ্য হয়েছে। তবে তাতে তাদের কারবারে ভাটা পড়েনি। বৈধ তেল ব্যবসায়ীদের একাংশ মনে করছেন, সরকারি নিয়মেই বড় ফাঁক থেকে গিয়েছে। আর সেই ভাঙা বেড়ার ফাঁক গলেই অসাধু ব্যবসায়ীরা বেরিয়ে যাচ্ছে। ভেজাল তেল কারবারিদের মূল ঠিকানা কালিয়াগঞ্জ ও কুশমণ্ডি। দুই জেলার সীমানা। মাঝে দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। কৃষিপ্রধান দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা ও উত্তর দিনাজপুর জেলায় প্রচুর রাইস অয়ে উৎপাদন হয়। বাজারে পাম তেলও সহজলভ্য। রাইস অয়েল ও পাম অয়েলের দাম কম। খাঁটি সর্ষের তেলে রাইস অয়েল এবং পাম অয়েল সহজে মেশানো যায়। সর্ষের তেলের রং আনার জন্য কেমিক্যালও বাজারে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ভেজাল তেল বলুন বা মিক্সড অয়েল, আবার অনেকের মতে অ্যাডেড সর্ষের তেল তৈরির পথ মসৃণ হয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের।

উত্তর দিনাজপুর তেল মিল সংগঠনের সম্পাদক বিনোদ লোহিয়ার এমনটাই অভিমত। নিজেদের লাভের ক্ষেত্র তৈরি করতে অসাধু ব্যবসায়ীরা একবার ব্যবহার হওয়া টিনে নতুন করে সর্ষের তেল ভরে বাজারে আনে। যেখানে প্রতি টিনে লাভ হয় ৮০-৯০ টাকা। নিয়ম হচ্ছে, নতুন টিনে সর্ষের তেল ভর্তি করতে হবে। হাতেগোনা খাঁটি সর্ষের তেল উৎপাদনকারী কয়েটি তেল মিল ছাড়া কেউ এই নিয়ম মানে না। কারণ তাতে লাভ অনেকটা কমে যায়। বিনোদ লোহিয়ার মতে, সমস্ত উপকরণ হাতের কাছে থাকায় অসাধু তেল ব্যবসায়ীদের কারবার রমরমিয়ে চলেছে। তার পরিণতি হিসেবে দেশে কানপুরের পরে বিখ্যাত কালিয়াগঞ্জের সর্ষের তেল মিল অদূর ভবিষ্যতে বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকৃত খাঁটি সর্ষের তেল উৎপাদনকারী মিল মালিকদের। একটি বিশেষ সূত্রের দাবি, মিক্সড বা অ্যাডেড সর্ষের তেল তৈরির বৈধ লাইসেন্স একসময় দিয়েছিল সরকার। বর্তমানে তা বন্ধ। সেই লাইসেন্সধারীদের একাংশ উত্তরবঙ্গজুড়ে মেশানো সর্ষের তেল তৈরি করছেন। কুশমণ্ডি ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক সুমিত বর্মন বলেন, মিক্সড তেল অবশ্যই ক্ষতিকর। তবে মিক্সড বা ভেজাল তেলের ক্রেতার সংখ্যা বেশি। নিম্নবিত্ত মানুষ কম দামের তেল খোঁজ করেন। আর এই সুযোগে ভেজাল তেল তৈরি চলছে। ট্যাংকারে করে রাইস অয়েল আসছে। পুলিশ ও প্রশাসনকে কোথাও ফাঁকি দিয়ে আবার কোথাও হাতে রেখে পাইলিং চলছে।

- Advertisement -

বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। অথচ নিঃশব্দে চলছে ভেজাল সর্ষের তেল তৈরি। আইসি মানবেন্দ্র সাহা বলেন, পুলিশ পুরো ঘটনার ওপরেই নজর রেখেছে। গৌড়বঙ্গজুড়ে সর্ষে উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সহ কৃষি অধিকর্তা (শস্য ও সুরক্ষা) অনির্বাণ লাহিড়ি বলেন, শস্য উৎপাদনে জেলায় ঘাটতি আছে। প্রশাসনের তৎপরতায় কুশমণ্ডিতেও হয়তো এই কারবার কিছুদিন বন্ধ হবে। কিন্তু চিরতরে বন্ধ হবার পথ কী? কালিয়াগঞ্জ নিবাসী গবেষক রাজকুমার জাজোদিয়ার মতে, সর্ষের উৎপাদন আশানুরূপ নয়। তাই সরকার বাজারে জোগান অব্যাহত রাখতেই মিক্সড অয়েলের অনুমতি দিয়েছিল একসময়। সরকারের সব নিয়ম মেনে মিক্সড মাস্টার্ড অয়েল তৈরির ক্ষেত্রে রয়েছে নানা জটিলতা। ছোট মিল মালিকদের পক্ষে যা কখনোই সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, সর্ষের তেলের বাইরে যে খাবার তেল আসছে সেটা সরকার ভালোভাবে জেনেবুঝেই আনার অনুমতি দিচ্ছে। আবার প্রশাসনকে ধরপাকড় করে অসাধু পথটাকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে। অসাধু উপায়ে সর্ষের তেল তৈরি বন্ধ হবে নাকি চলতেই থাকবে? আর কতদিন তার খেসারত দিয়ে যেতে হবে আমজনতাকে, এই প্রশ্ন সকলের।