দার্জিলিং-উত্তর দিনাজপুর সীমান্তে বালি মাফিয়াদের মুক্তাঞ্চল মহানন্দা

330

রণজিৎ ঘোষ, বিধাননগর : নামেই নদী, আসলে এটা বালি মাফিয়াদের মুক্তাঞ্চল। মাঝনদীতে আর্থমুভার নামিয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা লরিতে বালি বোঝাই করা হচ্ছে, এমনকি নদীর মাঝে ৬০-৭০ ফুট গর্ত করে ভূগর্ভস্থ বালি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এই কর্মকাণ্ড যেখানে চলছে তার ৩০-৪০ মিটারের মধ্যেই ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে মহানন্দা সেতু রয়েছে। এই নদী দার্জিলিং ও উত্তর দিনাজপুর জেলার বর্ডার লাইন। দেশের অন্যান্য প্রান্তের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এই সেতুর উপরেই নির্ভর করে। সকাল থেকে রাত-সবার চোখের সামনেই এভাবে নদী থেকে বালি পাচার হচ্ছে। অথচ প্রশাসনের কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই। দার্জিলিং জেলা প্রশাসনের দাবি, নদীর যে এলাকা থেকে বালির এই কারবার হচ্ছে সেটা পুরোপুরি উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া ব্লকে পড়ছে। যেভাবে ওই নদী থেকে অবাধে বালি তুলে নেওয়া হচ্ছে তাতে এই সেতুও দুর্বল হচ্ছে বলে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত জানান। অভিযোগ, প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদত ছাড়া কোনওভাবেই দিনের আলোয় এই বেআইনি কাজ চলতে পারে না। চোপড়ার বিডিও জুনেইদ আহমেদ বলেন, সরকার থেকে বালিঘাট লিজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নদীতে আর্থমুভার নামিয়ে বালি তোলা হচ্ছে বলে আমার কাছে খবর নেই। ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর এ বিষয়ে বলতে পারবে। চোপড়ার ব্লক ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক দীপেন লামা বলেন, আমরা মাঝে মাঝেই সমস্ত নদীতে অভিযান চালাই। এভাবে মাঝ নদীতে বালির কারবারের খবর আমার জানা নেই।

এই মহানন্দা সেতু দার্জিলিং ও উত্তর দিনাজপুর জেলার সীমান্ত হিসাবে পরিচিত। ফাঁসিদেওয়া ব্লকের মুরালীগঞ্জ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরেই ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের বুক চিরে নদীটি চলে গিয়েছে। এই নদীকে ঘিরেই কোটি কোটি টাকার বালি পাচারের কারবার হচ্ছে বলে অভিযোগ। মহানন্দা সেতুতে দাঁড়ালেই স্পষ্ট দেখা যায়, সেতু থেকে প্রায় ৩০-৪০ মিটারের মধ্যেই মাঝ নদীতে প্রচুর লরি দাঁড়িয়ে রয়েছে। একাধিক আর্থমুভার দিয়ে মাঝ নদী থেকে বালি তুলে গাড়িতে ভর্তি করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাঝ নদীতেই মোটা মোটা পাইপ পুঁতে নদীগর্ভ থেকে বালি তোলা হচ্ছে। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, কোথাও ৫০ ফুট, কোথাও ৬০ ফুট গভীরে পাইপ পুঁতে পাম্পসেটের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ বালি তোলা হচ্ছে। নদীতটের বালির চেয়ে এই বালির দাম কয়েকগুণ বেশি। এই পুরো কারবার চালানোর জন্য নদীর মাঝেই একাধিক ঘর তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বালি মাফিয়াদের অফিস, বিশ্রামের ব্যবস্থাও রয়েছে। রাতে বালি তোলার জন্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও রয়েছে। রীতিমতো জেনারেটরের সাহায্যে সন্ধ্যা থেকে রাতভর মাঝ নদীতে আলো জ্বালানো হচ্ছে।

- Advertisement -

পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত বলেন, ভযংকর ঘটনা। কোনো আইনেই এভাবে নদীতে এত আর্থমুভার নামিয়ে ও নদীগর্ভ থেকে বালি তুলে তা গাড়িতে বোঝাই করা যায় না। প্রশাসনের বিষয়টি কড়া দৃষ্টিতে দেখা উচিত। ফাঁসিদেওয়ার বিডিও সঞ্জু গুহ মজুমদার বলেন, মহানন্দা নদীতে যে জায়গা থেকে বালি তোলা হচ্ছে সেটা পুরোপুরি উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া ব্লকের মধ্যে পড়ছে। আমাদের এলাকায় কিছু নেই। তবুও আমি বিষয়টি ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরকে দেখতে বলব। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের বিরোধী দলনেতা তথা বিধাননগর, মুরালীগঞ্জ এলাকা থেকে নির্বাচিত সদস্য কাজল ঘোষ বলেন, মহানন্দা নদীকে ঘিরে এখানে বালি মাফিয়ারাজ চলছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তর দিনাজপুর জেলা প্রশাসন সবকিছু দেখেও চুপচাপ বসে রয়েছে। সবার চোখের সামনেই দিনরাত নদীজুড়ে এভাবে বেআইনি কাজ হচ্ছে। অথচ কেউই কিছু জানে না বললে তো বিশ্বাস করা যায় না। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহানন্দা সেতুর কাছাকাছি এলাকায় নদী থেকে বালি তোলায় যে কোনওদিন সেতুটি ধসে পড়তে পারে। তার দায় কে নেবে?