হিলিতে পাথরের কারবার ঘুরিয়ে দিচ্ছে ভাগ্যের চাকা

312

বিধান ঘোষ, হিলি : পাথরের কত প্রকারভেদ। কোনও পাথরে বাড়ি কিংবা রাস্তা নির্মাণ হয়। কোনও পাথরে আবার নাকি ভাগ্য বদলায়। অন্তত জ্যোতিষ মতে, ভাগ্য বদলে পাথরের কেরামতির বিকল্প নেই। হিলিতে আবার পাথর ঘুরিয়ে দিচ্ছে অনেকের ভাগ্যের চাকা। যাদের ভাগ্য পাথর ঘুরিয়ে দিচ্ছে, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা আছে, প্রশাসনের বা পুলিশের আধিকারিক আছে এবং কিছু পাথর মাফিয়া রয়েছে। এদের সঙ্গে করেকম্মে খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে একদল স্থানীয় মানুষ। হিলিতে যে পাথরের এত ক্ষমতা, তা আনা হচ্ছে ঝাড়খণ্ড থেকে। বাংলাদেশ সীমান্তে এপার বাংলার হিলির স্থলবন্দর দিয়ে পাথর রপ্তানির বৈধ সুযোগ আছে বটে, কিন্তু এই অসাধু কারবারিদের হাত?শে বৈধ পরিমাণের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ পাথর রোজ পাচার করা হচ্ছে বাংলাদেশে। অতিরিক্ত পাথর পাচারের টাকা বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসছে হাওয়ালার মাধ্যমে। প্রতি মাসে পাথরের এই কারবারের হাত ধরে হিলিতে কোটি কোটি টাকা উড়ছে, যার ভাগ যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি স্তরে। পতিরাম থেকে ডাবরা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার রাস্তার পাশে বিভিন্ন জায়গায় এজন্য পাথরের ১৭টি ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরি করা হয়েছে। ডাম্পিং গ্রাউন্ডগুলিতে ঝাড়খণ্ডের পাকুড় থেকে বিভিন্ন সাইজের পাথর লরিতে করে এনে ফেলা হচ্ছে। তারপর স্থানীয় লরিতে লোডিং করে বাংলাদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। লরিগুলিতে সরকারি নিয়মে অনুমোদিত বহন ক্ষমতার তিনগুণের বেশি পাথর লোড করা হয়। দেখা যাচ্ছে, একটি ১০ চাকার লরিতে ৫৫ টন পর্যন্ত পাথর বেআইনিভাবে লোড করা হচ্ছে। ডাম্পিং গ্রাউন্ডগুলির অধিকাংশ অবৈধ। কোনও কোনওটির জমির পরিমাণে অসংগতি আছে। দেখা যাচ্ছে, যে পরিমাণ জমির সরকারি অনুমোদন আছে ডাম্পিং গ্রাউন্ডগুলির জন্য, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি জমি ব্যবহার করা হচ্ছে।

এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে। এই অবৈধ কারবারের ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি পড়লেও প্রশাসনের নজরদারির অভাব রয়েছে। বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদারের কথায়, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার পুলিশ ও প্রশাসনের অকর্মণ্যতা, অপদার্থতা ও যোগসাজশে হিলিতে পাথরের অবৈধ কারবার চলছে। রপ্তানির সুযোগ নিয়ে যে টাকা এই কারবার থেকে উঠছে, তার ভাগ স্থানীয় স্তর থেকে শুরু করে কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। হিলি সীমান্তে কান পাতলেই বোঝা যায়, ডাম্পিং গ্রাউন্ড, লরিতে ওভার লোডিং ইত্যাদি। নিয়মের অতিরিক্ত পাথর রপ্তানি করার জন্য হাওয়ালার মাধ্যমে যে টাকা আসে, স্তরে স্তরে তার বখরা দিতে হয়। বখরা নির্দিষ্ট সব জায়গায় পৌঁছে দিলে তবেই ছাড়পত্র মেলে কারবারের। ছোট আকারের পাথর লোডিংয়ের জন্য লরি পিছু ৩ হাজার ও ওভার লোডিংয়ের জন্য ৬ হাজার টাকা ট্রিপ পিছু দিতে হয়। হিলির পাথরের ব্যবসায় যুক্ত থাকায় তালিকায় নাম রয়েছে এক বিধায়ক, পুলিশের এক সাব-ইনস্পেকটর, এক প্রাক্তন সেনা জওয়ান এবং শাসক দলের কয়েজন জেলা-নেতা ঘনিষ্ঠদের। হিলির এই চোরাগোপ্তা কারবারের খবর ক্রমশ ফাঁস হচ্ছে বহিরাগতদের নজর পড়ায়। তারাও এখন এই কারবারে যুক্ত হতে মরিয়া। ফলে বহিরাগতদের আগমনে সংঘাত শুরু হয়েছে হিলিতে। এর ফলে পাচারের ভিতরের নানা তথ্য সামনে আসছে। প্রভাবশালীদের মধ্যে শুরু হয়েছে স্নাযুযুদ্ধ। ইতিমধ্যে এমন এক প্রভাবশালীর নির্দেশে হিলির এক্সপোর্টার্স কমিটি ভেঙে গিয়েছে। ওই কমিটির তহবিল থেকে এক তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতেরও অভিযোগ উঠেছে।

- Advertisement -

বিবাদ এখন এমনই যে, বারদুয়েক এক্সপোর্টার্স কমিটি নতুন করে গঠনের চেষ্টা করা হলেও ওই লক্ষাধিক টাকা নিয়ে বিবাদের জেরে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এক্সপোর্ট ব্যবসায় এই অস্থির পরিস্থিতির কারণে আবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। প্রশাসন বা পুলিশের সব ঘটনাই জানা। কারণ, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এই কারবার ও তা নিয়ে বিবাদে বিভিন্ন সময় রিপোর্ট দিয়েছে। ওই রিপোর্টে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে হাওয়ালার মাধ্যমে আসা টাকা হাওয়ালা কারবারিরা পাথর ব্যবসায়ীকে নগদে মেটায়। পুরো চক্রে রাজনৈতিক নেতা থেকে প্রভাবশালীরা যুক্ত রয়েছে। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকেও পাঠানো হয়েছে। হাওয়ালা ছাড়াও পাথরের টাকা অনেক সময় নগদে না দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো হয় সমমূল্যের সোনার বিস্কুট। বাংলাদেশের পাথর কারবারিরা সেদেশের সোনার ব্যবসায়ীদের টাকা দিয়ে দেয়। সেই সোনা কারবারিরা ভারতে অবৈধভাবে সোনা পাঠায়। ভারতের সোনা কারবারির কাছ থেকে সেই টাকা পাথর ব্যবসায়ীরা নগদে সংগ্রহ করছে। হিলিতে এখন মূলত তিনজনের তত্ত্বাবধানে এই কারবার চলছে। তারা হিলিতে বসেই ভারত, বাংলাদেশ ও আরবে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। কারবারে অন্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা হয় বলে জানা গিয়েছে। এই কারবারে যুক্তদের সূত্রে জানা গিয়েছে, অ্যাপটি বোটিম নামে পরিচিত। হাওয়ালার কারবারে অনেক চুনোপুঁটিও রয়েছে।