আলিপুরদুয়ার শহরে জলাশয় ভরাট করে বহুতল তৈরি হচ্ছে

320

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার : আলিপুরদুয়ার শহরে একের পর এক জলাশয় ভরাট করে তৈরি হচ্ছে বহুতল। বহুবার তা নিয়ে হইচই হয়েছে। জলাশয় বাঁচাও কমিটি তৈরি করে আন্দোলনও করেছে সমাজকর্মীদের একটা বড়ো অংশ। এসেছে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, প্রশাসনিক রিপোর্টও তৈরি হয়েছে। কিন্তু বন্ধ হয়নি জলাশয় ভরাট। কাদের মদতে দখল হচ্ছে জলাশয়? সব জেনেও কেন চুপচাপ বসে আছে প্রশাসনের কর্তারা? মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করার সাহস দেখাচ্ছে কারা উঠেছে সেসব প্রশ্ন উঠছে শহরজুড়ে।

ভূমি সংস্কার এবং মৎস্য দপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আলিপুরদুয়ার পুর এলাকায় বড়ো জলাশয়ে সংখ্যা ১৬। শহরের বর্ধিত অংশ বা দমনপুর মৌজাকে যোগ করলে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮। কাগজে-কলমে এদের কোনোটি ঝিল, কোনোটি ডোবা হিসাবে চিহ্নিত। সরকারি খাসজমিতে থাকা ওইসব জলাশয় বাদ দিলেও শহরজুড়ে ব্যক্তিগত জমিতে অসংখ্য জলাশয় আছে। অভিযোগ, জমি মাফিয়াদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার পরিকল্পনামাফিক একের পর এক জলাশয় বুজিয়ে ফেলছেন। তারপর সেখানে তৈরি হচ্ছে বহুতল। কীভাবে জলাশয় ভরাট হচ্ছে, তা শহরবাসীর অজানা নয়। সম্প্রতি ভাঙাপুল এলাকায় বহু পুরোনো একটি জলাশয় রাতারাতি মাটি ফেলে ভরাট করে দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে শহরজুড়ে শোরগোল পড়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে এসে প্রতিবাদ করার সাহস দেখাচ্ছেন না কেউই। আশপাশে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে ওই জলাশয় ভরাটের পেছনে মদত রয়েছে বর্তমানে আলিপুরদুয়ারের রাজনীতিতে প্রভাবশালী একাধিক ব্যক্তির। এক প্রভাবশালী ঠিকাদারেরও মদত আছে।

- Advertisement -

মত্স্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাঙাপুলের জলাশয়টির আয়তন প্রায় ২ একর বা ৬ বিঘা। ভূমিসংস্কার দপ্তর সূত্রে খবর, ওই জলাশয়টি লিজ ল্যান্ডে পরিবর্তিত করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, কোনো জলাশয় লিজ ল্যান্ড হলেই কি সেখানে মাটি ফেলে ভরাট করা যায়? প্রাক্তন ভূমিসংস্কার আধিকারিক এবং ভূমিসংস্কার আইন বিশেষজ্ঞ শ্যামল দাস জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই জলাশয় ভরাট করা যায় না। তিনি বলেন, জলাশয় লিজ ল্যান্ড হতে পারে। তবে তার চরিত্র জলাশয়ই থাকবে। সরকার মাছ চাষ বা অন্য কোনো কারণে জলাশয় লিজ দিতে পারে। তবে মাটি ফেলে ভরাট করা পুরোপুরি বেআইনি। যারা ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত। শহরে একের পর এক জলাশয় দখল হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দমকল কর্তারাও। আলিপুরদুয়ার পুরসভা সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে জলাশয় রক্ষার আবেদন করে একাধিকবার চিঠিও পাঠিয়েছেন তাঁরা। যেভাবে জলাশয়গুলি দখল হচ্ছে তাতে বড়োসড়ো অগ্নিকাণ্ড হলে শহরকে রক্ষা করার জন্য জলের অভাব দেখা দেবে বলেও সতর্ক করেছেন দমকল আধিকারিকরা। জলাশয় রক্ষায় দীর্ঘদিন থেকেই আন্দোলন করছে জলাশয় বাঁচাও কমিটি। সংগঠনের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও জলাশয় রক্ষার দাবি জানানো হয়েছিল। তার প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ৫ মার্চ জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠান পুর ও নগর উন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। সেই চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, শহরের জলাশয়গুলি বাঁচাতে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।  সেই নির্দেশ কি বাস্তবে কার্যকর হয়েছে? জলাশয় বাঁচাও কমিটির আহ্বায়ক ল্যারি বোস বলেন, আলিপুরদুয়ারে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করে এখনও একের পর এক জলাশয় ভরাট হচ্ছে। আমরা এতে হতভম্ব। দীর্ঘ প্রতিবাদেও কোনো ফল হল না। আমরা হতাশ হয়ে কার্যত হাল ছেড়ে দিয়েছি। জলাভূমি ভরাটের অসাধু চক্রের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা এখন আমাদের দেখে কটাক্ষ করে। যদিও আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের ভূমি ও ভূমিসংস্কার আধিকারিক অপর্ণা মণ্ডল বলেন, জলাশয় রক্ষায় কড়া পদক্ষেপ করা হচ্ছে। সেজন্য ইতিমধ্যেই আমরা সমীক্ষা করে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছি। সেই রিপোর্ট নবান্নে পাঠানো হচ্ছে। যারা জলাভূমি দখল করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইন মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।