অবৈধ নির্মাণের জেরে লোচকা আজ নালা

75

মহম্মদ হাসিম, বাগডোগরা : বলে না দিলে লোচকাকে আর নদী বলে মনে হবে না এখন। নদীর দুপাশে দুই ব্লক। মাটিগাড়া এবং নকশালবাড়ি। দুই ব্লকের সীমানায় থাকা এই পাহাড়ি নদীতে যে একসময় তিরতির করে জল বইত, নদীর বর্তমান চেহারা দেখে তা কি আর বোঝার উপায় আছে? একশ্রেণির মানুষের সীমাহীন লোভ আর অসচেতনতার দাপটে লোচকাকে এখন নদী বলেই মনে হয় না আর। দখলদারি আর আবর্জনার দাপটে নদী আজ গতি হারিয়েছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, কেউ যেন অদৃশ্য জাদুবলে ছিনিয়ে নিয়েছে নদীর সবটুকু প্রাণশক্তি। সারাবছর নদীতে জল না থাকলেও বর্ষায় সামান্য বৃষ্টি হলেই এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীর দুপাশ পাথর দিয়ে বাঁধানো রয়েছে বটে, কিন্তু দখলদারির চোটে নদী ক্রমশ ছোট হয়ে আসায় পাথরের পাড় দিয়ে নদীর জল আটকানো যায় না এখন। তাই বন্যার হাত থেকে বাঁচতে মাটিগাড়া-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের লোচকাপল্লিতে গ্রামবাসীরা নিজেরাই কংক্রিটের পাড় নির্মাণ করতে শুরু করেছেন। কিন্তু প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে এভাবে নদীতে পাড়বাঁধ তৈরি করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মাটিগাড়ার বিডিও শ্রীবাস বিশ্বাসের কথায়, লোচকাপল্লি থেকে নদীতে পাড়বাঁধ নির্মাণের কোনও প্রস্তাব এখনও আমার কাছে আসেনি। নদীতে কংক্রিটের পাড়বাঁধ নির্মাণের কথা আমার এই মুহূর্তে জানা নেই। আমি দ্রুত ওই এলাকায় পরিদর্শনে যাব। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব। বহুবার চেষ্টা করেও শিলিগুড়ি সেচ দপ্তরের কার্যনির্বাহী ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

- Advertisement -

লোচকাপল্লির বাসিন্দারা অবশ্য অন্য কথা বলছেন। তাঁদের অভিযোগ, নদীর চর দখল করে বেআইনি নির্মাণের জন্যই এলাকায় প্রতি বছর বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অথচ দখল রুখতে প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করেনি। দীর্ঘদিন ধরে নদীতে বাঁধ নির্মাণের আবেদন নিবেদন করেও কোনও লাভ হয়নি। এলাকার বাসিন্দা মনোবালা রায়ের বক্তব্য, বর্ষায় নদীর জলে এলাকার ঘরবাড়িতে জল ঢুকে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এলাকায় পাড়বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছি। কেউ কথা শোনেনি আমাদের। তাই উপায় না পেয়ে আমরা নিজেদের টাকা খরচ করে কংক্রিটের পাড়বাঁধ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছি। একই বক্তব্য আরেক বাসিন্দা শ্যামল বর্মনেরও। তিনি বলেন, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নদীতে অবাধে দখলদারি চলছে। আবর্জনায় নদী ভরে গিয়েছে। তার ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। বর্ষায় পুরো এলাকা জলে থইথই করে। তখন কাজকর্ম তো দূরের কথা, পরিবার নিয়ে কার্যত ঘরবন্দি অবস্থায় থাকতে হয়। প্রশাসনের তো এদিকে কোনও নজর নেই। তাই আমরা এমন উদ্যোগ নিয়েছি।

একটা সময় ছিল, যখন কাচের মতো স্বচ্ছ জল বইত লোচকা নদীতে। নদীর পরিষ্কার জলে ওপর থেকেই দেখতে পাওয়া যেত নানা ধরনের নুড়ি-পাথর। ছোট বড় বিভিন্ন মাছও মিলত নদীতে। কিন্তু সেসব এখন কোথায়? বর্ষায় সময় ছাড়া নদীতে জলই থাকে না সারাবছর। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ দিয়ে নকশালবাড়ি ব্লকের গোঁসাইপুর গ্রাম পঞ্চায়েত ছাড়িয়ে মাটিগাড়া ব্লকের লোচকাপল্লিতে এই দখলদারির ছবি স্পষ্ট। নদীর চর দখল করে কংক্রিটের ঢালাই করে গজিয়ে উঠেছে পাকা বাড়ি, কোথাও আবার মাথা তুলেছে আস্ত একটা গ্রাম। লোচকাপল্লির কণিকা বর্মনের কথায়, আমাদের বাড়ির সামনেই লোচকা নদী। এই নদীতে একসময় আমরা মাছ ধরতাম। এত গভীর ছিল যে, কাছে যেতেই ভয় পেতাম আমরা। কিন্তু আজ নদীর অবস্থা দেখে সত্যি খুব দুঃখ হয়। নদী আজ আবর্জনায় ভরে উঠেছে। অনেকের বাড়ির শৌচালয়ে নালাও নদীর সঙ্গে যুক্ত। ফলে নদীতে দূষণ বাড়ছে। যে যার মতো নদীর জায়গা দখল করে কংক্রিটের দেওয়াল তৈরি করছেন। প্রশাসন নির্বিকার। লোচকাপল্লি পেরিয়ে মেডিকেল মিনি মার্কেট হয়ে এই লোচকা নদী বালাসনের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।