আলিপুরদুয়ারে রমরমিয়ে বেআইনি বহুতল নির্মাণ

182

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : কারও পৌষমাস তো কারও সর্বনাশ। কার্যত লকডাউন পরিস্থিতিতে এক শ্রেণির মানুষের পেটে ভাত নেই। আরেক শ্রেণির মানুষ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একের পর এক বহুতল তৈরিতে ব্যস্ত। অভিযোগ, পুর আইনের কোনও তোয়াক্কা না করেই আলিপুরদুয়ারে এই বহুতলগুলির রমরমা। কোথাও ফুটপাথের গা ঘেঁষে তৈরি বহুতল সেই ফুটপাথের ওপরই বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকে পড়ছে। কোথাও সরকারি রাস্তা ঘেঁষে বাড়ি তৈরি হচ্ছে। দিনকে-দিন এই প্রবণতা বাড়ছে। সূত্রের খবর, এই আবাসন তৈরি নিয়ে পুরসভার বোর্ড মিটিংয়ে কোনও আলোচনা হয় না। অভিযোগ, পুরকর্মীদের একটি অংশ নিজেদের মতো করে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করিয়ে দিচ্ছেন। আর এরই জেরে শহরজুড়ে এই বিপজ্জনক প্রবণতার বাড়বাড়ন্ত। আলিপুরদুয়ার পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান মিহির দত্ত বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এখানে বেআইনিভাবে কোনও বহুতল গড়ে উঠেনি। বেআইনিভাবে কোনও বহুতল গড়ে উঠলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু বেআইনি নির্মাণ ভাঙা হয়েছে।

আলিপুরদুয়ার পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সিপিএমের অনিন্দ্য ভৌমিক বলেন, আমি সামান্য কিছুদিন পুরসভার দায়িত্বে ছিলাম। কিন্তু তার আগে কংগ্রেসের বোর্ড ও পরে তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে আলিপুরদুয়ার শহরে বড় বড় বহুতল তৈরি করা হয়েছে। শাসকদলের প্রভাবশালীরা এই বহুতলগুলি বানিয়েছে। পুরসভার এক শ্রেণির আধিকারিক বেআইনিভাবে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করিয়ে দিচ্ছেন। আলিপুরদুয়ারের নতুন বিধায়ক বিজেপির সুমন কাঞ্জিলাল বলেন, শহরজুড়ে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ফুটপাথের অংশজুড়ে বেআইনি নির্মাণ করে চলেছেন। পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলী তার অনুমোদন দিচ্ছে। না হলে দিনের পর দিন শহরে অলিগলিতে রাস্তা ঘেঁষে, জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল উঠতে পারে না। এই বেআইনি নির্মাণগুলি ভাঙতে জেলা শাসক ও পুর দপ্তরে চিঠি দেব। তৃণমূলের টাউন ব্লক সভাপতি তথা পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান দীপ্ত চট্টোপাধ্যায় বলেন, কংগ্রেস ও বামেরা পুরসভায় ক্ষমতায় থাকার সময়ে নিয়ম না মেনে বড় বড় বহুতল তৈরি হয়েছে। আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছি তখন মানুষ এই বহুতলগুলিতে বসবাস করা শুরু করেছেন। এই অবস্থায় কোনও নির্মাণই ভাঙা সম্ভব হয়নি। তবে পুরসভায় ক্ষমতায় থাকার সময় বেশ কিছু বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।

- Advertisement -

আলিপুরদুয়ার পুরসভা সূত্রে খবর, ২০১১ সালের আগে আলিপুরদুয়ার শহরে হাতেগোনা কয়েকটি বহুতল ছিল। পুরসভা থেকে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করার পর এই বহুতলগুলি গড়ে তোলা হয়। কিন্তু অভিযোগ, বর্তমান শহরে বিপজ্জনকভাবে অধিকাংশ বহুতল গড়ে উঠেছে। গোটা শহরে ৫০টিরও বেশি বহুতল রয়েছে। আলিপুরদুয়ার শহরের বক্সা ফরেস্ট রোড ও চৌপথি এলাকা থেকে শোভাগঞ্জ এলাকার রাস্তার দুপাশে এই বহুতলগুলি গড়ে উঠেছে। করোনার দুবারের প্রকোপের সুযোগ নিয়ে এই বহুতলগুলি তৈরির প্রবণতা বাড়ে বলে অভিযোগ। শহরের কলেজ হল্ট এলাকায় ফুটপাথের অংশজুড়ে বহুতলগুলি তৈরি করা হয়েছে। কলেজ হল্ট ছাড়াও নেতাজি রোড এলাকা, মধ্যপাড়া, নিউ টাউন, কলেজপাড়া, হাসপাতাল রোড, কোর্ট মোড় এলাকায় স্কুল, জুয়েলারি শপ, নার্সিংহোম, হোটেল থেকে বড় বড় বস্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। লকডাউন ও কার্যত লকডাউনের সময় এই বাড়িগুলির অংশবিশেষ তৈরি করা হয়।

আলিপুরদুয়ার হিমালয়ের খুব কাছেই অবস্থিত। ইন্দো অস্ট্রেলিয়ান-ইউরেশিয়া পাতের রোজকার ওঠানামায় এখানে মাঝেমধ্যেই ভূকম্পন অনুভূত হয়। ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। ২০২০ সালেও কম্পন অনুভূত হয়। ভূকম্পনের হাত থেকে বাঁচতে শহরে বহুতল গড়ায় লাগাম টানতে হবে বলে ২০১১ সাল থেকেই দাবি ওঠে। কিন্তু সেই দাবিকে কোনও মান্যতাই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।  গত দুতিন বছর ধরে আলিপুরদুয়ার পুরসভায় কোনও জনপ্রতিনিধি নেই। এখানে কখনও প্রশাসক আবার এখন প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান পুরসভা চালাচ্ছেন। এই সুযোগেই আলিপুরদুয়ার পুরসভা এলাকায় বেআইনিভাবে বহুতল গড়ার বাড়বাড়ন্ত বলে অভিযোগ।