অবাধে নদীর চর দখল আলিপুরদুয়ারে, মুখে রা নেই ডান-বামের

372

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, আলিপুরদুয়ার : কোথাও কালজানি, কোথাও ডিমা নদীর চর দখল করে আলিপুরদুয়ার পুর এলাকায় বিপজ্জনকভাবে একের পর এক বস্তি তৈরি হয়েছে। একটি মাফিয়াচক্র প্লট করে চরের জমি বিক্রি করছে। বেআইনি দখলদাররা সহজেই পুরসভার হোল্ডিং নম্বর, বিদ্যুতের সংযোগ পাচ্ছে। তবে ভোট বড় বালাই। তাই চরের জমি দখল বা জমি মাফিয়াদের নিয়ে শাসক বা বিরোধী কোনও পক্ষই মুখে রা কাড়ছে না।

কালজানি, ডিমা ও নোনাই-মূলত এই তিনটি নদী আলিপুরদুয়ার শহরকে ঘিরে রেখেছে। শহরের একদিকে কালজানি ও ডিমা অন্যদিকে নোনাই প্রবাহিত হয়েছে। শহরের একটি অংশে ডিমা কালজানিতে মিশেছে। আর তিন নদীর চর দখল করে একের পর এক বস্তি গড়ে উঠেছে। নদীর চর জমি মাফিয়াদের কাছে সোনার ডিম দেওয়া রাজহাঁসে পরিণত হয়েছে। নোনাইয়ের চরে দখলদারি তুলনামূলক কম হলেও শহরের ৪, ৯, ১০, ১১, ১৫, ১৮ প্রভৃতি ওয়ার্ডে চর দখল আলাদা মাত্রা পেয়েছে। কোথাও চর স্কোয়ার ফুট হিসাবে, কোথাও হাতের আন্দাজে খুঁটি পুঁতে বিক্রি হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, বন্যার হাত থেকে শহরকে বাঁচাতে ডিমা ও কালজানির ধার ঘেঁষে প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর বাঁধের দুই দিক থেকে দখলদারদের হটিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ফ্রি জোন তৈরি করেছিল। ওই জায়গা পুরোপুরিভাবে দখলদারদের হাতে চলে গিয়েছে বলেই অভিযোগ। বর্তমানে কয়েক হাজার পরিবার নদীর চরে রয়েছে। অভিযোগ, শুধু জমি বিক্রিই নয়, ওই জমিতে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া বা বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পুরসভার হোল্ডিং নম্বরও মাফিয়াচক্র পাইয়ে দিচ্ছে। জমির কারবারিদের বিরুদ্ধে ভিনজেলা বা রাজ্য থেকে বাসিন্দাদের এনে নদীর চরে বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

- Advertisement -

৯ নম্বর ওয়ার্ডে নদীর চরে গড়ে ওঠা হঠাৎ কলোনির এক বাসিন্দা বলেন, আড়াই লক্ষ টাকা দিয়ে জমি কিনেছিলাম। যারা বিক্রি করেছিল তারাই বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্যাসাগর কলোনির এক বাসিন্দা বলেন, জমি কেনার জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তবে জমির কোনও মাপ নেই। ওরা (মাফিয়ারা) হাতের আন্দাজে রশি টেনে দাগ কেটে দিয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ ও হোল্ডিং নম্বর দেওয়ার জন্য পরে আরও ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। আলিপুরদুয়ারে নদীর চর দখল কংগ্রেস আমলে শুরু হয়েছিল বলে শহরের প্রবীণ নাগরিকদের অনেকেই জানিয়েছেন। বন্যার প্রকোপে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও বাম আমলে ফের নতুন করে দখল শুরু হয়। বর্তমান শাসকদলের আমলেও একের পর এক নদীর চর দখল হচ্ছে বলেই অভিযোগ। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক মদতেই শহরে চর দখলের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে বলে আলিপুরদুয়ারজুড়ে অভিযোগ উঠেছে। পুরভোটের দোরগোড়ায় শহরের বিভিন্ন মহলে চর দখলের বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে। দখলদারদের হাতে বিভিন্নভাবে শহর রক্ষাকারী বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অভিযোগ। য়দিও এখন আর সেই সমস্ত অভিযোগ শাসক বা বিরোধীদলের কোনও নেতাই কানে তুলছেন না। উলটে তাঁরা চরবাসীদের মন জোগাতে ব্যস্ত। ১১ নম্বরের মতো বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে চরবাসীদের ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ করবে তা ডান-বাম সমস্ত পক্ষই ভালোমতো জানে। তাই সেই ভোট দখলে রাখতে সব দলের নেতারা ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছেন। পুরসভার বিদায়ি চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেতা আশিস দত্ত বলেন, ওঁরা বছরের পর বছর ধরে অনেক কষ্ট করে নদীর চরে বসবাস করছেন। আলিপুরদুয়ার শহরে অন্য কোথাও এত জায়গা নেই যেখানে ওঁদের পুনর্বাসন দেওয়া য়াবে। মানবিকতার খাতিরে আমরা ওঁদের পাশে আছি। বর্ষার সময় প্রত্যেক বছরই আমরা ওঁদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করি। কী করে ওঁরা আরও বেশি পরিষেবা পেতে পারেন সে বিষয়ে আমরা অবশ্যই নজর দেব। পুরসভার বিদায়ি বিরোধী দলনেতা সিপিএমের অনিন্দ্য ভৌমিক বলেন, নদীর চরে যে মানুষগুলো বসবাস করছেন তাঁদের সুরক্ষার জন্য আরেকটি বাঁধ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ওই মানুষগুলো পুরসভার ভোটার। তাঁরা বিদ্যুৎ সংযোগ সহ বিভিন্ন সুবিধা পাচ্ছেন। তাই তাঁদের পাট্টার মাধ্যমে জমির অধিকারও দেওয়া উচিত।